পশ্চিমাদের হাতের পুতুল কুর্দি জনগোষ্ঠী

পশ্চিমাদের হাতের পুতুল কুর্দি জনগোষ্ঠী

১৯৭২ সালের ৩০ জুন। কুর্দিদের নেতা ইদরিস বারজানি ও মাহমৌদ উসমান এক গোপন সফরে ভার্জিনিয়ায় সিআইয়ের দপ্তরে। সেখানে অপেক্ষা করছিল সিআইয়ের কিংবদন্তির পরিচালক রিচার্ড হেলমস। বারজানি ও উসমানকে এক চমকপ্রদ তথ্য দিল হেলমস। যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ষাটের দশকে কুর্দিরা স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টাতদবির করেও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পায়নি কুর্দিরা।

আপাত সমর্থনের কথা জানালেও হেলমস জানায়নি যে অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রের কুর্দি আবারও নীতি বদলে যাবে। ১৯৭৪ সালে ইরাকের মুখে কুর্দিদের ঠেলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পিছটান দেয়। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-কুর্দি সম্পর্কের বিবরণ এভাবেই দিয়েছে হাওয়াই প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রায়ান আর গিবসন।

ইতিহাস বলে বারবারই যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। স্বার্থ হাসিল করে বিপদে ফেলে ভেগেছে। তাই সিরিয়ার কুর্দি অঞ্চলে তুরস্কের হেমন্তে শান্তি আনয়নের অভিযানে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারে যারা হাহুতাশ করছে, তাদের জেনে রাখা উচিত নব্বইয়ের উপসাগরীয় যুদ্ধের পরও সাদ্দাম হোসেনের থাবার সামনে তাদের ফেলে রেখে যুক্তরাষ্ট্র বেমালুম চলে গিয়েছিল। অথচ প্রেসিডেন্ট সিনিয়র জর্জ বুশের ডাকে সাড়া দিয়ে কুর্দিরা সাদ্দামের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে পথে নেমেছিল। গণহত্যার শিকার হয়ে কুর্দিরা এর দায় শোধ করেছিল।

কুর্দিদের সঙ্গে পশ্চিমের প্রতারণা শুরু উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই। জনশ্রুতি আছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে পৃথক রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুর্দিদের হাত করেছিল ইউরোপীয়রা। এরপর যুদ্ধের অবসান হলে ফ্রান্স ও ব্রিটেন কুর্দি এলাকা দখলে নেয়। পরে তুরস্ক, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে বণ্টন করে দেয়।

কুর্দিদের বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পশ্চিমারা ব্যবহার করেছে। কখনো ইরাকের, সিরিয়া বা তুরস্কের বিরুদ্ধে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সম্মুখসমরে কুর্দিরাই ছিল অগ্রভাগে। ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্র হুট করে কুর্দিদের সমর্থন দিল কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৬৭ ও ১৯৭২এর আরবইসরায়েল যুদ্ধে ইরাকের অংশ নিতে না পারায়। কারণ, ওই সময় ইরাক উত্তরাঞ্চলে কুর্দিদের সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। কুর্দিদের অস্ত্র, অর্থ দিয়ে ইরাককে ব্যস্ত রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ৬৭ ও ৭২এর যুদ্ধের পর সিনাই, গোলানসহ বিভিন্ন এলাকা ইসরায়েলের দখলে গেল। আর কুর্দিদের হাতে সমগ্র অঞ্চল অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কায় ৭৪এ যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া থেকে আংশিক সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় লিখেছে, কুর্দিদের সঙ্গে সবাই প্রতারণা করেছে। সাদ্দামের ইরাকের বিরুদ্ধে কুর্দিদের উসকে দেওয়ার পেছনে ইসরায়েল ও ইরানের হাত ছিল। এখন আবার আহত আইএস যোদ্ধাদের ইসরায়েল নিজ শহরে চিকিৎসা দিয়েছে বলে রবার্ট ফিস্ক বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছে।

ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের কুর্দিঅধ্যুষিত এলাকা নিয়ে স্বাধীন কুর্দিস্তান গঠনের কথা অনেক দিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কুর্দিস্তানকে পশ্চিমারা আরেকটি ইসরায়েল বানাতে চেয়েছিল। স্বাধীন কুর্দিস্তান গঠন করা সম্ভব হলে আরবের দেশগুলোকে দুই দিক থেকে চাপে রাখা যাবে। একদিকে ইসরায়েলের চাপ। অপরদিকে কুর্দিস্তানের চাপ। সব মিলিয়ে আরব দেশগুলো দিশেহারা অবস্থায় থাকবে। কিন্তু কুর্দিরা এখনো পশ্চিমাদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তাই এই প্রকল্পও আটকে আছে। তুরস্কের সিরিয়া অভিযান এর বড় উদাহরণ।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ, আইসিসের বিরুদ্ধে কুর্দিদের সাফল্য, ইরাকে কুর্দিদের জন্য পৃথক অঞ্চল গঠনে অনেকেই মনে করেছিল কুর্দিস্তান এবার স্বাধীন হতে পারে। কিন্তু সিরিয়া যুদ্ধের নানা পক্ষের অংশগ্রহণ সম্ভাব্য কুর্দিস্তানের ভব্যিষৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তুরস্কের অপারেশন পিস স্প্রিং সব জল্পনাকে আরও ফিকে করে দিয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কুর্দিরা এখন রাশিয়া ও সিরিয়ার সরকারি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়েছে। কুর্দি বাহিনীর কমান্ডার মজলৌম আবদির মতে, কুর্দিদের জন্য দুটি বিকল্প আছে। গণহত্যার শিকার হওয়া অথবা সমঝোতা করা। শেষ পর্যন্ত কুর্দিদের সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স তথা বাশার আলআসাদের সঙ্গে সমঝোতাই করতে হলো। এত দিন এসডিএফ পেন্টাগনের অর্থে ও অস্ত্রে বাশারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। মূলত বাশারকে ক্ষমতা থেকে টলিয়ে দিতেই কুর্দিরা সমবেত হয়েছিল ২০১১ সালে আরব বসন্তের ধাক্কায়। সেই কুর্দিরা এখন সেই অস্ত্র ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের বিপরীতে ধরবে।

তুরস্ক কখনই কুর্দিদের উত্থানকে মেনে নেবে না। ২০১২ সালের জুলাইয়ে কুর্দিস ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন পার্টি (কেওয়াইডি) সিরিয়ার সীমান্তে একটি ছোট শহর দখল করে নেয়। কেওয়াইডি হচ্ছে তুরস্কের কুর্দি সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পাটির (পিকেকে) সিরীয় অংশ। স্বভাবতই তুরস্ক কুর্দিদের বিষয়ে শুরু থেকেই সতর্ক ছিল।

পিকেকে ১৯৮৪ সাল থেকে আংকারার বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ করছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আইএসের বিরুদ্ধে লড়ে কুর্দিরা সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়ে নেয়। কুর্দিদের সংগঠন সিরিয়ার ডেমোক্রেটিক ফোর্স এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় এবং আইএসকে পরাজিত করে। যদিও সিরিয়ার অনেক নাগরিকই মনে করেন, বস্তুত সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর হাতে আইএস পরাজিত হয়েছে। পেছনে ছিল রাশিয়া, ইরান ও হিজবুল্লাহ। শুরুতে তুরস্ক কুর্দিদের নড়াচড়াকে সাময়িকভাবে মেনে নিলেও শর্ত দিয়েছিল কুর্দিরা যেন ফোরাত নদী অতিক্রম করতে না পারে। কিন্তু কুর্দিরা ক্রমশই শক্তি সঞ্চয় করে ফোরাত অতিক্রম করে তুরস্কের সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিদের তুরস্কের হামলার মুখে ফেলে শুধু ভাগেইনি বরং ডোনাল্ড ট্রাম্প কুর্দিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, কুর্দিরা আটক আইএস জঙ্গিদের মুক্ত করে দিচ্ছে।

সিরিয়ার যুদ্ধ খুবই জটিল। একে সাধারণ তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা কঠিন। এখানে কে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বলা মুশকিল। ক্ষণে ক্ষণে এর রং বদলায়। সবাই আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু সবার হামলায় কেবল সাধারণ মানুষ মারা যায়। তবে এই যুদ্ধে কোনো পক্ষই হারেনি। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ পরাজিত হয়, তবে তা হবে কুর্দিদের।

জরুরি জন্মনিরোধক পিল শরীরের জন্য ক্ষতিকর

জরুরি জন্মনিরোধক পিল শরীরের জন্য ক্ষতিকর

অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি এড়াতে আজকাল জরুরি গর্ভনিরোধক পিল খাওয়ার একটা বেশ চল হয়েছে। অনেকে গর্ভধারণের ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে একই মাসে এ ধরনের জরুরি গর্ভনিরোধক পিল একাধিকবার খেয়েছেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই। সাধারণত অরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের ৭২ থেকে ১২০ ঘণ্টার মধ্যে এই পিল খেতে হয়।

এই পিল খাওয়ার পরও গর্ভসঞ্চার হতে পারে। এ পর্যন্ত পাওয়া উপাত্ত অনুযায়ী দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনে ২ জন নারী অরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই পিল খাওয়ার পরও গর্ভধারণ করেছেন।

এই পিল খাওয়ার অসুবিধা

১. পিল খাওয়ার পর অরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই পিল কার্যকর নয়।
২. এই পিল চর্ম ও যৌনরোগের হাত থেকে বাঁচায় না।
৩. পিল খাওয়ার পর বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
৪. নারীর স্তনে তীব্র ব্যথা হতে পারে।
৫. মাথাব্যথা হতে পারে।
৬. পরবর্তী মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।

যে পীর সাহেব নোয়াখালিতে গান্ধীকে নিস্তানাবুদ করেছিলেন

যে পীর সাহেব নোয়াখালিতে গান্ধীকে নিস্তানাবুদ করেছিলেন

ভারত ভাগের এক বছর আগে নোয়াখালীতে যে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয় তার পর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ঐ অঞ্চলে গিয়ে প্রায় মাস তিনেক সময় কাটায়। এ সময় বেশিরভাগ পায়ে হেঁটে সে পুরো অঞ্চলটি ঘুরে বেড়ায়, হিন্দু-মুসলমান সমাজের নানা অংশের সাথে কথা বলে, এবং বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে ভাষণ দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই: এই হানাহানি বন্ধ করে দুর্বলকে রক্ষা করা।

গান্ধীর ঐ সফরের এক পর্যায়ে তার একটি ছাগল চুরি যায়। সে ছাগলের দুধ পান করত। ফলে, এই চুরির ঘটনার জন্য দায়ী করে নোয়াখালীবাসীকে হেয় করার প্রচেষ্টা আজকের দিনেও দেখা যায়। কিন্তু ঐ সামান্য ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ঐ অঞ্চলের এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের এক বছর আগে থেকেই অবিভক্ত বাংলা প্রদেশ ছিল অগ্নিগর্ভ। হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পারষ্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ঘৃণা এমন এক অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছিল যার জেরে ১৬ই অগাস্ট, ১৯৪৬ ঘটে যায় পূর্ব ভারতের ইতিহাসের কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ - 'দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস'

দাঙ্গা শুরুর প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাণ হারায় ৪,০০০ নিরীহ হিন্দু ও মুসলমান, এবং গৃহহীন হন এক লক্ষেরও বেশি মানুষ।

যেভাবে শুরু হয় দাঙ্গা:
দশই অক্টোবর ছিল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানার করপাড়ার জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে ভারত সেবাশ্রম সংঘের এক সন্ন্যাসী এসে উঠেছে। তার নাম সাধু ত্রিয়াম্বাকানন্দ। সে ঘোষণা করেছে, পূজার জন্য ছাগবলির বদলে এবার সে মুসলমানের রক্ত দিয়ে দেবীকে প্রসন্ন করবে।

এটা বারুদে স্ফুলিঙ্গের কাজ করে। করপাড়া থেকে সামান্য দূরে শ্যামপুর দায়রা শরীফ। মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনী এই পীর বংশের উত্তর পুরুষ।
১০ই অক্টোবর ভোরবেলা চৌকিদারের মারফৎ রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কাছে একটি চিঠি পাঠান এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।

কিন্তু রাজেন্দ্রলাল এতে সাড়া না দিলে মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনী সকালে শাহ্‌পুর বাজারে তার অনুগত ভক্ত এবং মুসলমানদের এক সমাবেশ ডাকেন।

সেখানে তিনি মুসলমানদের সেই সময়কার অবস্থান তুলে ধরেন এবং হিন্দু জমিদারকে উৎখাত করার ডাক দেন।

রায়পুরের জমিদার চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরী নোয়াখালীতে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তিকে গোড়া থেকেই মেনে নিতে পারছিল না। এ নিয়ে তার সাথে মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর শুরু হয় দ্বন্দ্ব।

কংগ্রেস নেতাদের কাছে চিঠি:
যেহেতু চিত্তরঞ্জন কংগ্রেসের সাথে যুক্ত ছিলে, তাই  হুসেইনী কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতা এমনকি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কাছেও চিঠি পাঠিয়ে জমিদারের অত্যাচারের কথা জানান এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন।

কিন্তু কোন সাড়া না পেয়ে তিনি নিজেই চিত্তরঞ্জন রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেন।

তার অধীন আধাসামরিক বাহিনী 'মিয়ার ফৌজ' এবং এক সহযোগীর অধীন 'কাশেম ফৌজ'র সদস্যরা রায়পুরের জমিদার বাড়ি অবরোধ করে।

এসব ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়লে নোয়াখালী জেলার রায়পুর, রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া এবং পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা (বৃহত্তর কুমিল্লা) জেলার চাঁদপুর, চৌদ্দগ্রাম, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ এবং লাকসাম থানার বিশাল এলাকাজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

নোয়াখালীতে শান্তি মিশনে মি. গান্ধী ১১৬ মাইল হেঁটে প্রায় ৪৭ টি দাঙ্গা-ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পরিদর্শন করে।

মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর গদ্দিনশীন পীর ছাড়াও তিনি ছিলেন নোয়াখালী কৃষক সমিতির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা। কৃষকের খাজনা মওকুফ, ঋণ সালিশি বোর্ড থেকে সুদখোর ব্যবসায়ীদের উৎখাত করা এবং জমিদারি বাজার বয়কট করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি তৎকালীন নোয়াখালীর ক্ষমতাধর হিন্দু জমিদার এবং মহাজনদের চক্ষুশূল হয়েছিলেন।

১৯৩৭ সালে রামপুর ও রায়গঞ্জ নির্বাচনী এলাকার কৃষক প্রজা পার্টির টিকেটে নির্বাচন করে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ১২,০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন এবং বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। অবশ্য পরে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

কিন্তু উনার কৃষকপন্থী নীতির কারণে তিনি কখনই নোয়াখালীর 'হিন্দু ভদ্রলোকদের' কাছের মানুষ হতে পারেননি। যার পরিণতিতে কংগ্রেস তার ব্যাপারে প্রথমদিকে আগ্রহী হলেও পরে আর উনাকে দলে টানতে পারেনি।

শান্তির লক্ষ্যে পদযাত্রা:
গান্ধী নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ৬ই নভেম্বর। পরদিন চৌমুহনীতে যোগেন্দ্র মজুমদারের বাড়িতে দুই রাত কাটিয়ে ৯ই নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সে তার শান্তির লক্ষ্যে পদযাত্রা শুরু করে।

এর পরের দিনগুলোতে সে খালি পায়ে মোট ১১৬ মাইল হেঁটে প্রায় ৪৭ টি দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম পরিদর্শন করে। এসময় সে নিয়মিত প্রার্থনা সভা পরিচালনা ছাড়াও স্থানীয় মুসলমানদের সাথে বৈঠক করে হিন্দুদের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে।

নোয়াখালীতে এসে গান্ধী মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর সাথেও দেখা করতে চায়।

মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর ততদিনে গান্ধীর ওপর সম্পূর্ণভাবে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই তিনি প্রথম দিকে সাক্ষাতে রাজী ছিলেন না।

পরে গান্ধীর আহ্বানে চাটখিলে দুজনের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে তিনি গান্ধীকে বলেন যে, "দাঙ্গার সূত্রপাত নোয়াখালীতে নয়। কলকাতা ও বিহারে যখন দাঙ্গা থেমে যাবে তখন নোয়াখালীতেও হানাহানি বন্ধ হবে"।

গান্ধীর ছাগল:
গান্ধী ছাগলের দুধ পান করত। তাই সে সাথে করে একটি ছাগল এনেছিল।
কিন্তু চাটখিলের বৈঠকের আগে কাশেম ফৌজের লোকজন ছাগলটিকে হস্তগত করেছিল। চাটখিলে ঐ বৈঠকে সেই ছাগলের রান্না গোশত নিরামিষাশী গান্ধীর সামনে পরিবেশন করা হয়। এর মাধ্যমে মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার হুসেইনীর একটি বার্তা দিয়েছিলেন।

(তথ্যসূত্র: বাঙলা ভাগ হলো - জয়া চ্যাটার্জী; Communalism, the Noakhali Riot and Gandhi - Rakesh Batabyal; 1946: The Great Calcutta Killings and Noakhali Genocide - Dinesh Chandra Sinha: Ashok Dasgupta; Noakhali's Darkest Hour - Andrew Whitehead; Syed Ghulam Jamaluddin Baker Husseini; Wikipedia.)

ঘৃণাসূচক চিহ্ন হাতের আঙ্গুল দিয়ে 'ওকে' বা 'ঠিক আছে' চিহ্ন

ঘৃণাসূচক চিহ্ন হাতের আঙ্গুল দিয়ে 'ওকে' বা 'ঠিক আছে' চিহ্ন

তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুল একত্রে গোল করে দেখানো মানে ঠিক আছে- যা অনেকের কাছেই খুব জনপ্রিয় একটা ইমোজি
তর্জনী এবং বৃদ্ধাঙ্গুল একত্রে গোল করে দেখানো মানে ঠিক আছে- যা অনেকের কাছেই খুব জনপ্রিয় একটা ইমোজি। কিন্তু ঘৃণা বা মানহানিকর বক্তব্যের বিরোধী সংগঠন অ্যান্টি-ডিফামেশন লীগ (এডিএল) বলছে, অনেকে এই চিহ্নটি দিয়ে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ প্রকাশ করে।

ফলে এটিকে তারা 'ঘৃণাসূচক চিহ্নের অন্যতম বলে তালিকাভুক্ত করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্বেষ-প্রতিরোধী গ্রুপগুলো বলছে, এই প্রতীকের অনেক বেশি ব্যবহারের ফলে এখন কোন কিছুর অনুমোদন বা 'ঠিক আছে' জাতীয় বক্তব্যের প্রকাশও বলা যেতে পারে।

সুতরাং এই প্রতীক যারা ব্যবহার করছে, তাদের সম্পর্কে চট করে সিদ্ধান্তের পৌঁছানো ঠিক হবে না বলেই তারা মনে করে।

এডিএলের ঘৃণাসূচক প্রতীকের তালিকায় আরো রয়েছে নিউ নাৎসি প্রতীক পোড়ানো, হ্যাপি মার্চেন্টের ছবি।

২০০০ সাল থেকে 'ঘৃণার প্রকাশ' তালিকা তৈরি করতে শুরু করে অ্যান্টি-ডিফামেশন লীগ। তাদের এই তালিকার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যাতে চরমপন্থিদের নানা চিহ্ন দেখে চিনতে পারে।

অরিগনে একটি সমাবেশে চরম ডানপন্থি গ্রুপ প্রাউড বয়ের সদস্যরা এই চিহ্ন দেখাচ্ছেন
এখন পর্যন্ত এই তালিকায় ২০০ বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নাৎসি স্বত্বিকা এবং কু ক্লাক্স ক্লানের জ্বলন্ত ক্রুশ।

''হয়তো অনেক বছর বা দশক ধরে চরমপন্থি লোকজন এসব প্রতীক ব্যবহার করে আসছে, কিন্তু তারা নিয়মিতভাবে নতুন নতুন প্রতীক, মেমে এবং শ্লোগান তৈরি করছে, যা দিয়ে তারা তাদের ঘৃণাসূচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটায়,'' বলছেন এডিএলের প্রধান জনাথন গ্রেনব্লাট।

''আমরা বিশ্বাস করি, এসব প্রতীক সম্পর্কে আইনপ্রয়োগকারী এবং পুলিশের পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকা উচিত। এর ফলে সমাজে বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘৃণাকারী এসব ব্যক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে প্রথমেই সতর্ক হওয়া যাবে।''

ধারণা করা হয়, সতেরো দশকের দিকে যুক্তরাজ্যে প্রথম হাতের দুই আঙ্গুল একত্রে করে 'ঠিক আছে' প্রতীক ব্যবহার করা শুরু হয়।

এডিএল বলছে, 'ওকে' প্রতীকটি এখন নিজেদের জাহির করার জন্য ডানপন্থীদের কাছে জনপ্রিয় একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যারা প্রায়ই এ ধরণের চিহ্ন প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে থাকে।

ধারণা করা হয়, সতেরো দশকের দিকে যুক্তরাজ্যে প্রথম হাতের দুই আঙ্গুল একত্রে করে 'ঠিক আছে' প্রতীক ব্যবহার করা শুরু হয়।
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ মসজিদে যে ব্যক্তি ৫১জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল, আদালতে নেয়ার পর তাকে এই 'ওকে' চিহ্ন প্রকাশ করতে দেখা যায়।

হত্যাকাণ্ডের জন্য সে দোষী নয় বলে দাবি করে।

ডানপন্থী আন্দোলন বিশেষজ্ঞ, ইতিহাসবিদ ড. পল স্টোকার বলছেন, চরম ডানপন্থী ব্যক্তিদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অন্যতম প্রতীক হলো এই 'ওকে' চিহ্নটি।

''সেই সব লোকজনের জন্য এটা হচ্ছে একটা সাংকেতিক বার্তা যারা চরম ডানপন্থীদের কাজকর্ম সম্পর্কে জানে এবং বুঝতে পারে'' তিনি রেডিও নিউজবিটকে বলেছেন।

''এই প্রতীক দিয়ে গোঁড়া সমর্থকদের বোঝানো হয় যে, তিনি তাদেরই একজন।''

এই লেখক বলছেন, চরমপন্থিদের মধ্যে এটা খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার যে, এই প্রতীকটি তারা প্রকাশ্য স্থানে দেখাচ্ছে এবং পরিষ্কারভাবে তার অর্থ ঘোষণা করছে।

''ডানপন্থীদের মধ্যে নানা ধরণের প্রতীকের ব্যবহার বাড়ছে। তারা মূলত অনলাইনে সক্রিয় থাকে এবং সাংকেতিক বার্তা এবং মেমে ব্যবহার করে। এগুলো দেখে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ বলে মনে হবে, কিন্তু আপনি যদি তাদের ভালো করে বিশ্লেষণ করেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে, এর বিশেষ মানে রয়েছে।''

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ মসজিদে যে ব্যক্তি ৫১জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল, আদালতে নেয়ার পর তাকে এই 'ওকে' চিহ্ন প্রকাশ করতে দেখা যায়।
অ্যান্টি-ডিফামেশন লীগ এটাও পরিষ্কার করে দিতে চায় যে, এ ধরণের চিহ্ন দেখানোর সবসময় যে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রকাশ, তা নাও হতে পারে। বরং এটাও হতে পারে যে, এর আসলেই অর্থ, 'সব কিছু ঠিক আছে'

''এই আঙ্গুলের বার্তার অতিরিক্ত ব্যবহারের পেছনে এখন প্রথাগত উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।''

''ফলে কেউ যদি এই প্রতীকটি ব্যবহার করে, তাহলেই প্রথমেই এটা ধরে নেয়া ঠিক হবে না যে সে কাউকে ব্যাঙ্গ করার জন্য নাকি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রকাশের চিন্তা থেকে প্রতীকটি ব্যবহার করছে।''

জাতিসংঘে ইমরান খানের সেই জ্বালাময়ী ভাষোন!!

জাতিসংঘে ইমরান খানের সেই জ্বালাময়ী ভাষোন!!


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ইয়াকানাবুদু ওয়া ইয়া কানাসতায়ীন

মি. প্রেসিডেন্ট। সম্মানিত সেক্রেটারি। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ।

আজ আমি বিশ্ব নেতাদের এই ফোরামে আমার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে সম্মানিত বোধ করছি যেখানে আমাদের বিশ্বের সমস্যাসমূহ আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আমি অনেক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চাই, তবে আজ শুধু চারটি নিয়ে আলোচনা করব। বিশেষ করে আমার দেশ কঠিন সময় ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সত্ত্বেও আমি এই ফোরামে এসেছি। জরুরী সমস্যাগুলো বিশ্ববাসীর অবশ্যই জানা প্রয়োজন।

প্রথমেই আমি শুরু করতে চাই জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে। অনেক নেতা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু আমি মনে করি তারা প্রকৃতপক্ষে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করছেন না। অনেক বিশ্বনেতা যারা এই বিষয়ে কিছু করতে চান তারাও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না।

আমাদের অনেক আইডিয়া আছে। কিন্তু বলা হয়ে থাকে, অর্থায়ন ছাড়া আইডিয়া শুধুমাত্র অবাস্তব কল্পনা।

পাকিস্তান, আমি আমার নিজ দেশের সম্পর্কে আপনাদের বলছি। পাকিস্তান হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের একটি। আমরা আমাদের নদীগুলোর উপর নির্ভর করি। পাকিস্তান মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের ৮০ ভাগ পানি আসে হিমবাহ (তুষারস্রোত) হতে, এসব হিমবাহ শুধুমাত্র পাকিস্তানের অংশ হতে নয় এমনকি ভারত হতেও, কারাকোরাম হিমবাহ, হিমালয় ও হিন্দুকুশ হিমবাহ হতে এবং এগুলো প্রবাহিত হয় বিপদজনক গতিতে। আমরা ইতিমধ্যে আমাদের পর্বতগুলোতে ৫০০০ হিমবাহ চিহ্নিত করেছি। আমরা সেখানে আশঙ্কা করছি বড় আকারের আকস্মিক বিপর্যয়ের।

কেপি, পাকিস্তানের একটি রাজ্য যেখানে আমরা ৫ বছরে কয়েক বিলিয়ন গাছ লাগিয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য ১০ বিলিয়ন গাছ রোপন করা। কিন্তু একটি রাষ্ট্র একা কিছু করতে পারে না। এখানে প্রয়োজন বিশ্বের সমন্বিত উদ্যোগ।

তবে আমি আশাবাদী যে, সর্বশক্তিমান আমাদের বড় একটি শক্তি দান করেছেন - সেটা হচ্ছে মানবসম্পদ। আমরা বড় ও মহৎ কিছু করতে পারি। এবং এখানে আমি আশাবাদী বৃহৎ ও ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘই নেতৃত্ব দিবে। ধনী দেশগুলোকে অবশ্যই চাপ দিতে হবে। গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনের জন্য ধনী দেশগুলোরই মূলত দায় বেশি। সুতরাং আমি অনুধাবন করি এই বিষয়ে জাতিসংঘই নেতৃত্ব দিবে।

আমি এখন ২য় যে ইস্যুটি নিয়ে বলতে চাই তা খুবই জটিল একটি বিষয়।

প্রত্যেক বছর বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা দরিদ্র দেশগুলো থেকে ধনী দেশগুলোতে প্রাচার হয়ে যাচ্ছে। মুদ্রা পাচার, কর ফাঁকি, পশ্চিমা দেশে বিলাসবহুল সম্পত্তি ক্রয়ের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরা এটা করছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য এটা ধ্বংসাত্মক। এর ফলে ক্রমশ ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর পার্থক্য আরো বাড়ছে। মাদক এবং সন্ত্রাসে অর্থায়নের মতো মানি লন্ডারিংকে একইভাবে ট্রিট করা হচ্ছে না। বর্তমানে দরিদ্র দেশগুলোর সম্পদ তাদের এলিটরা লুট করে নিচ্ছে।

যখন আমি এক বছর পূর্বে আমার দেশের দায়িত্ব নিলাম, আমি দেখলাম গত ১০ বছরে আমাদের দেনার পরিমাণ চারগুণ বেড়েছে। সারা বছর আমরা যত রাজস্ব সংগ্রহ করি তার অর্ধেক ব্যয় হয়ে যায় দেনার দায় মিটাতে।

কিভাবে আমরা আমার ২২০ মিলিয়ন জনসংখ্যার ব্যয় নির্বাহ করবো যখন দেনা মিটাতে অর্ধেক অর্থ ব্যয় হয়ে যায়? আমরা দেখতে পাই, দুর্নীতিবাজ নেতাদের দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং এর সম্পত্তি পশ্চিমা পুঁজিতে বিনিয়োগকৃত। এটা উদ্ধার করা আমাদের জন্য অনেক কঠিন।

লুট করা অর্থ উদ্ধার করা গেলে আমরা মানব উন্নয়নে সেটা ব্যয় করতে পারতাম। কিন্তু আইন এসব অপরাধীদের রক্ষা করছে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে আইনজীবি নিয়োগ দেয়ার অর্থ আমাদের নেই।

আমাদের ধনী দেশগুলো হতে সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু মি. প্রেসিডেন্ট এটা খুব জটিল।

ধনী দেশগুলোর অবশ্যই রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। দরিদ্র দেশগুলো হতে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থের পাচার তারা অনুমোদন দিতে পারে না। কিভাবে দরিদ্র দেশগুলো জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা (SDG) অর্জন করবে যেখানে মানব উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থ সহজেই আমাদের দেশসমূহ হতে পাচার হয়ে যাচ্ছে?

ক্ষমতাশীল এলিটদের বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রাচার করতে সুযোগ দেয়া উচিত নয়। আমি বুঝতে পারি না, কেন ট্যাক্স হেভেন অনুমোদিত। (ট্যাক্স হেভেন হলো এমন দেশে যারা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের খুবই কম ট্যাক্সে বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করে)। কেন এই ট্যাক্স হেভেন? কেন এটা অনুমোদিত? কেন গোপন হিসাব?

বিশ্বে পরিবর্তন হচ্ছে। গরীব আরো গরীব হচ্ছে এবং ধনী হচ্ছে আরো ধনী। এটা বড় একটি সংকট তৈরি করবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিকে অবশ্যই এসব লুটপাট বন্ধ করার একটি উপায় বের করতে হবে।

আমার তৃতীয় পয়েন্টটি ইসলামফোবিয়া সম্পর্কে। বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন। পৃথিবীর সবকটি মহাদেশেই মুসলমানদের বসবাস। নাইন ইলেভেনের পর থেকে আশঙ্কাজনকভাবে ইসলামফোবিয়ার ক্রমবৃদ্ধি। এই বৃদ্ধিটা উদ্বেগজনকও বটে। শুধু উদ্বেগজনকই নয়, এটাই মূলত বিভাজন সৃষ্টি করেছে।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার, মুসলিম মহিলাদের সাধারণ হিজাব পরাটাও আজ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে! সাধারণ হিজাবকেও অস্ত্রের মতো দেখা হচ্ছে।

কোনও কোনও দেশের কিছু ভদ্র মহিলা তাদের গায়ের পোশাক খুলে ফেলতে পারেন, তাই বলে কি আর কেউ পোশাক পরতে পারেন না! আর কেনই-বা এমন হচ্ছে? কারণ, কিছু পশ্চিমা লিডার ইসলামকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে নিয়েছেন।

উগ্রবাদী ইসলাম (Radical Islam) আবার কী? ইসলাম তো একটাই। আর সেটা হযরত মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসলাম। সেখানে আবার ইসলামফোবিয়া কেন? আমার জানতে ইচ্ছে করে, একজন আমেরিকান কীভাবে র‌্যাডিক্যাল মুসলিম ও মোডারেট মুসলিম বলে মুসলমানদেরকে ভাগ করতে পারে! আমাদের ধর্মে মোটেই এসবের কোনও সম্পর্ক নেই। বিদেশ ভ্রমণের সময় আমরা ইসলামফোবিয়ার মুখোমুখি হয়েছি। ইসলামফোবিয়া ইউরোপিয় দেশগুলোতে মুসলমানদেরকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। আর এ পরিস্থিতি উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমার বক্তব্য হলো, আমাদেরকে অবশ্যই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। নাইন ইলেভেনের পর র‌্যাডিক্যাল ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ পশ্চিমা নেতাদের বার বার বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, র‌্যাডিক্যাল ইসলাম বলে আদৌ কিছু নেই।

সব সমাজেই কট্টরপন্থী রয়েছে। কিন্তু করুণা ও ন্যায়বিচার সব ধর্মের মূল কথা। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মুসলিম নেতৃবৃন্দ এ ব্যাখ্যা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা মুসলিম বিশ্বকেও ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছি যে র‌্যাডিক্যাল ইসলাম বলে কিছু নেই। একসময় পাকিস্তানে আমরা ঝড়ের কবলে ছিলাম এবং আমাদের সরকার enlightened moderation নামে একটি স্লোগান তৈরি করেছিলেন।

যেহেতু নাইন ইলেভেনের হামলাকারীরা আত্মঘাতী ছিল, সঙ্গত কারণে আত্মঘাতী হামলা সম্পর্কেও একটু বলা দরকার। নাইন ইলেভেনের ব্যাপারটি ছিল অনেকটা স্বর্গীয় কুমারীর মতো। নাইন ইলেভেনের এই উদ্ভট ঘটনাটি ঘটেছিল আত্মঘাতী হামলার ইসলামিকরণের জন্যে। তামিল টাইগার আর জাপানের কামিকাজে বোমারু নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা যখন আত্মঘাতী হামলা করে, তখন আর কেউ ধর্মকে দোষে না। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, কোনও ধর্মই সহিংসতার শিক্ষা দেয় না।

পশ্চিমাদের ইসলামফোবিয়ার কারণ সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধান আছে। আমি পশ্চিমের দেশগুলোতে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি ক্রিকেট খেলে। পশ্চিমাদের মন-মানস কীভাবে কাজ করে, তা আমি ভালো করে জানি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, ইসলামফোবিয়ার অন্যতম কারণ ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত সেই বই। যেখানে জঘন্য ভাষায় নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছিল।

পশ্চিমারা আসল সমস্যা বুঝতে পারলেন না। কেননা, ইসলাম সম্পর্কে তাদের গভীর অনুধাবন নেই। ইসলামের শান্তি-সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নয়। তাই ইসলাম তাদের কাছে একটি উগ্র, সাম্প্রদায়িক ও মারমুখো অসহিষ্ণু ধর্মের নাম।

দুই-তিন বছর পর পর কেউ একজন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেন আর আমরা মুসলমানরা আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে শান্তিপূর্ণভাবে এর ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করি। এ প্রতিবাদই আবার পশ্চিমাদের কাছে হয়ে ওঠে উগ্রবাদ, অসহিষ্ণুতা! এটাই মুসলমানদের কপাল!

পশ্চিমের সবাই খারাপ অথবা সবাই ভালো এটা বলা যাবে না। খারাপের সংখ্যা নেহায়েত সামান্য। এই সামান্য সংখ্যক খারাপ লোকই মুসলমানদের উস্কে দেওয়ার জন্যে দায়ী। আমি তাদেরকেই দায়ী করবো।

আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন একজন আদর্শ মানব, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের বাস্তব নমুনা। আমরা কেবল তাঁর আদর্শে বেঁচে থাকতে চাই। রাসুল মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাকে বলে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র।

আমি ইসলাম সম্পর্কে এমন অদ্ভুত বিষয় শুনেছি, যা ইসলাম সম্পর্কে নির্ঘাত মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই না। ইসলাম নাকি নারীবিরোধী, সংখ্যালঘুবিরোধী। অথচ, মদিনা রাষ্ট্রই সর্বপ্রথম নারী, অসহায় ও বিধবার দায়িত্ব গ্রহণ করে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। মদিনা রাষ্ট্র ঘোষণা করে ছিল, কালো-ধলো সকল মানুষ একসমান।

রাসূল ঘোষণা করেছিলেন, সবচেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে দাসকে মুক্ত করা। কারও দাস-দাসী থাকলে তার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করুন। রাসূলের এ ঘোষণার ফলে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। দাসরা রাজা হয়ে গেলেন। এমনকি দাসদের রাজবংশও তৈরি হয়ে গেল।

সংখ্যালঘুসহ সকল ধর্মের ধর্মীয় উপাসনাঘর রক্ষা করাও ইসলামি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলি আলাইহিস সালাম যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে একজন সাধারণ ইহুদি নাগরিকের কাছে মামলায় হেরে গেলন। নিরপেক্ষ আদালত মামলার রায় দেন ইহুদি নাগরিকের পক্ষে। এটাই ইসলাম। যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কোনও মুসলিম সম্প্রদায় যখন সংখ্যালঘুদের প্রতি অবিচার করেন, তখন সেটা আমাদের ধর্মের শিক্ষার বিরুদ্ধে যায়।

আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের হৃদয়ে বাস করেন। যখন তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়, তখন আমাদের হৃদয়ে আঘাত লাগে। ব্যথা অনুভব করি। যে ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একসময় মনের ব্যথা দেহে ভর করে। মুসলমানরা তখনই কেবল প্রতিবাদের ভাষায় প্রতিবাদ করেন।

আমি সবসময় এ বিষয় নিয়ে ভাবতাম যে, কখনও যদি আমার এমন পরিবেশে কথা বলার সুযোগ হয়, তখন আমি ইসলাম সম্পর্কে বিশ্বকে এ বার্তাটিই দেব।

পশ্চিমা সমাজে হলোকাস্টকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। কেননা, এর অবমাননা ইহুদি সম্প্রদায়কে আঘাত করে। আমরা আমাদের নবীর ক্ষেত্রেও একই শ্রদ্ধার আবেদন করি। দয়াকরে আমাদের নবীকে কটাক্ষ করে আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করবেন না। এটাই আমাদের অনুরোধ।

এবার আমার চতূর্থ পয়েন্ট। মি. প্রেসিডেন্ট, এটাই সবচাইতে জটিল বিষয় এবং বিশেষ করে এটার জন্যই আমার এখানে আসা। হ্যাঁ, এটি হচ্ছে কাশ্মীরে যা ঘটছে সে সম্পর্কে।

ক্ষমতায় আসার পর আমার প্রথম অগ্রাধিকার ছিল পাকিস্তান হবে এমন দেশ যে শান্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবে।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যোগ দেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান তার সময়ের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিবাহিত করেছে। আমাদের ৭০,০০০ লোক যুদ্ধে মারা গিয়েছে, আমাদের অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ১৫০ বিলিয়ন ডলার।

১৯৮০র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে পাকিস্তান পশ্চিমাদের সাথে কাজ করে। গেরিলা যোদ্ধা নামে খ্যাত মুজাহিদ বাহিনীকে পশ্চিমারা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র অর্থায়ন করেছিল এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সোভিয়েত তাদেরকে সন্ত্রাসী বলত, যেখানে আমেরিকানরা তাদের বলতো মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত আফগানিস্তান থেকে পলায়ন করে। আমেরিকা আফগানিস্তান ত্যাগ করে আর পাকিস্তানও মুজাহিদ গ্রুপকে ত্যাগ করে।

অতঃপর ৯/১১ আসলো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান যক্তরাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হলো। কিন্তু আমরা এই যুদ্ধের জড়িত হইনি। কেন? কারণ পশ্চিমারা ও আমরা তাদের বিদেশী দখলদারদের বিরুদ্ধে জিহাদে তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু এবার আমেরিকা আফগান দখল করে বসে আর প্রত্যাশা করে, আমরা মুজাহিদদের বলব, তোমারা সন্ত্রাসী, তোমরা স্বাধীনতা সংগ্রামী না। এটা হাস্যকর। তাই পাকিস্তান নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে, ধ্বংসলীলায় জড়ায়নি।

৭০ হাজার পাকিস্তানী নিহত হলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অথচ ৯/১১ এর সাথে কোনো পাকিস্তানী জড়িত ছিলো না। তালেবান, আল কায়েদা আফগানিস্তানে তৈরি হয়েছে, পাকিস্তানে নয়। কিন্তু ৭০ হাজার পাকিস্তানী নিহত হয়েছে!

আমি জানি যে ভারত বলে আসছে আমাদের জঙ্গি সংগঠন আছে কিন্তু আমি জাতিসংঘ পর্যবেক্ষককে এসে দেখার আমন্ত্রণ জানাই। পাকিস্তানে কোনো জঙ্গি গ্রুপ থাকবে না এটা আমাদের সিদ্ধান্ত।

ভারত প্রসঙ্গে বলি। ভারতের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা বলি। উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের সুবাদে ভারতে আমার অনেক ভক্ত অনুরাগী রয়েছে, ভারতে আমার অনেক প্রিয় বন্ধু রয়েছে। আমার ভারত ভ্রমণ করতে সবসময় পছন্দ করি।

সুতরাং আমার দল ক্ষমতায় আসার পর আমার প্রথম উদ্যোগ ছিল ভারতের সঙ্গে। নরেন্দ্র মোদিকে বললাম, আমাদের সমস্যাগুলি একই। আসুন আমরা একসঙ্গে কাজ করি। দরিদ্রতা,জলবায়ুর পরিবর্তনে একসাঙ্গে কাজ করি। বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে আমরা সম্পর্কন্নোয়নে কাজ করি।

কিন্তু তিনি প্রতিউত্তরে বললেন, পাকিস্থান সবসময় আমাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। আমি বলি, আমাদের সমস্যা একই। ঠিক একইভাবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ভারতীয় গুপ্তচর কলভূষণ যাদভ ধৃত হয়েছে। সে স্বীকারও করেছে যে, সে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর হয়ে কাজ করছিল। কিন্তু আসুন আমরা সেসব বিরোধপূর্ণ বিষয় পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাই শান্তির জন্যে। এটা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ। কিন্তু মোদি তা মানল না। তিনি আমাদের সঙ্গে সব সংলাপ বাতিল করলেন।

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে ২০ বছর বয়ষী এক ছেলে আত্মঘাতি বোমা হামলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য হত্যা করল। মোদি তাৎক্ষণিকভাবে দোষ চাপালেন পাকিস্থানের উপর। আমি বললাম, আপনি একটা প্রমান দেখান যে, পাকিস্থান এর সঙ্গে জড়িত,তাহলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করব।

পুলওয়ামা হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার প্রমাণ দেখানোর পরিবর্তে তারা পাকিস্থানের উপর বিমান হামলা চালালেন। আমরাও বদলা নিলাম এবং আমাদের শক্তি দেখিয়ে দিলাম। আমরা তাদের যুদ্ধ বিমানও ভূপাতিত করেছি এবং তাদের পাইলটকেও জীবিত আটক করেছি, কিন্তু সৌজন্যতা,উদারতার খাতিরে দ্রুত তাকে ভারতে ফেরত পাঠিয়েছি। এটা আমাদের উদারতা,দূর্বলতা নয়।

আর মোদি আপনি বিমান হামলা চালিয়ে আমাদের যথেষ্ট ক্ষতি করেছেন। আপনি আমাদের ১০টি গাছ ধ্বংস করেছেন। আমরা আবহাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলছি,কাজ করছি, আপনি সেখানে আমাদের ১০টি গাছ বিনা কারনে বিমান থেকে বোমা বর্ষনে ধ্বংস করেছেন। এটা আমাদের একটা বিরাট ক্ষতি !

মোদি নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন যে, তিনি পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, এটি ছিল ট্রেইলার, পূর্ণ মুভি পরে আসছে। আমরা ভাবলাম, এটা নির্বাচনে জেতার জন্য দেয়া বক্তৃতা। নির্বাচনের পর আমরা স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যাবো। কিন্তু বিষয়টি তা ছিলো না।

নির্বাচনের পর আমরা বুঝতে পারি অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ভারত FATF কালো তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া সংবিধানের ৩৭০ নং আর্টিকেল তারা বাতিল করল। কাশ্মীরে প্রচুর সেনা সমাবেশ করল। এখন কাশ্মীরে মোট সেনার পরিমাণ ৯ লাখের বেশি। এর মাধ্যমে ৮ মিলিয়ন লোকের উপর কারফিউ জারি করা হল।

একজন লোক কিভাবে এটা করতে পারে! এটা বুঝার জন্য আপনাকে জানতে হবে আরএসএস সম্পর্কে। আমি আরএসএস সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে চাই। মি. নরেন্দ্র মোদি আরএসএস এর আজীবন সদস্য। আরএসএস এমন একটি সংগঠন যেটি এডলফ হিটলার এবং মুসোলিনীর হিংস্র আদর্শে অনুপ্রাণিত। নাৎসীরা যে পদ্ধতিতে অন্য সকল জাতি হতে নিজেদের সেরা ভাবতো একই ভাবে আরএসএসও নিজেদের সবার চেয়ে সেরা মনে করে।

আরএসএস ভারত থেকে মুসলমানদের জাতিগত নিধনে বিশ্বাসী। এটা সবাই জানে, আরএসএস হিন্দুত্ববাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। তারা মুসলিম ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। তারা বিশ্বাস করে মুসলিম শাসনের ফলে হিন্দুত্ববাদের সোনালী যুগের অবসান ঘটেছে। তারা সরাসরি মুসলিম ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। এটা সবাই জানে। গুগল করে আপনি জানতে পারবেন আরএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা গোলকওয়ার। এই ঘৃণার আদর্শ ১৯৪৮ সালে হত্যা করেছে ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীকে।

এই ঘৃণার আদর্শ আরএসএস এর গুন্ডাদেরকে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০০০ মুসলিমকে জবাই করতে প্রেরণা দিয়েছিল। মোদির নির্দেশে গেরুয়া পাঞ্জাবী পরে ৩ দিন ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল আরএসএস সন্ত্রাসীরা। তাদের তান্ডবে ২০০০ মুসলিম নিহত হয় এবং গৃহহীন হয় ১৫০,০০০ মুসলিম।

কংগ্রেস পার্টি বিবৃতি দিয়েছিল আরএসএস এর ক্যাম্পসমূহে সন্ত্রাসীরা রয়েছে। মোদি তখন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে আমেরিকা ভ্রমণ করতে পারেন নি।

৮ মিলিয়ন লোককে বন্দী করে রাখা হয়েছে! এটা কেমন মানসিকতা! সেখানে নারী শিশু অসুস্থ মানুষ রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব কী ভাবছে? ৮ মিলিয়ন পশু বন্দী? তারা মানব সন্তান।

জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের উগ্র চিন্তাধারা নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপিকে অন্ধ করে দিয়েছে। যখন কারফিউ উঠে যাবে তখন কী ঘটবে তারা চিন্তা করছে?

গত ৩০ বছরে কাশ্মীরে ১ লাখ নাগরিক নিহত হয়েছে, ১১ হাজার নারী ধর্ষিতা হয়েছে। এটা জাতিসংঘের রিপোর্ট। কিন্তু বিশ্ববাসী কিছু করছে না। কারণ তারা দেখছে ভারত তাদের জন্য ১.২ বিলিয়ন জনসংখ্যার বিশাল বাজার। বস্তুগত স্বার্থের কাছে বলি হচ্ছে মানবতা।

মোদি বলছে এটা কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্য। কিন্তু যখন ৮ মিলিয়ন কাশ্মীরি বন্দীত্ব ভেঙ্গে ৯ লাখ সেনার মোকাবেলা করবে তখন কী ঘটবে? আমি আশঙ্কা করছি রক্তগঙ্গা বইবে।

কাশ্মীরিদেরকে খাঁচাবন্দী পশুর মতো বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদেরকে এমনকি প্রো‌-ইন্ডিয়ানদের‌ও গ্রেফতার করা হয়। ১৩ হাজার যুবককে ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। যুবকদের ছড়রা গুলি দিয়ে অন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এতে আরো চরমপন্থা বাড়বে।

আমরা আশঙ্কা করছি আরেকটি পুল‌ওয়ামা ঘটনার। এবং যথারীতি ভারত এর জন্য দায়ী করবে পাকিস্তানকে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, সীমান্তে ৫০০ সন্ত্রাসী অপেক্ষা করছে। ৯ লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে ৫০০ সন্ত্রাসী কী করবে!

ইসলামিক টেররিজম টার্ম ব্যবহার করে ভারত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং কাশ্মীরীদের উপর নির্যাতন বৃদ্ধি করে।

কেন তারা শান্তি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত করছে? কারণ ভারতের হাতে বিকল্প নেই। কাশ্মীরে তাদের নিষ্ঠুরতার প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি পুলাওয়ামার মতো ঘটনা ঘটবে এবং তারা আমাদের দায়ী করে আবার পাকিস্তানে বোমা মারার চেষ্টা করবে।

আপনারা কি মনে করেন না যে, কাশ্মীরে ৮ মিলিয়ন লোকের দুর্দশা ভারতের ১৮০ মিলিয়ন মুসলমানকেও চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে?

ইহুদী কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া কী হবে যখন মাত্র ৮ হাজার ইহুদিকে বন্দী করা হবে? ইউরোপীয়ানরা কী প্রতিক্রিয়া জানাবে? যেকোনো মানব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

সময় এখন খুবই জটিল। কিছু ঘটলে পাকিস্তানকে দায়ী করা হবে। ইতিমধ্যে পরমাণু শক্তিধর দেশ দুটি ফেব্রুয়ারি তে মুখোমুখি হয়েছিল। এজন্য জাতিসংঘের দায়িত্ব রয়েছে। ১৯৪৫ সালে এজন্যই প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ।

যদি আমরা পেছনে তাকাই, ১৯৩৯ সালে যখন মিউনিখ দখল করেছিল চেকোশ্লাভাকিয়া। বিশ্ব সম্প্রদায় ১.২ বিলিয়ন লোকের সমস্যা প্রশমনের জন্য কিছু করেছে? ন্যায়বিচার ও মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে? পারমাণবিক শক্তিধর দুটি দেশ প্রচলিত যুদ্ধে মুখোমুখি হলে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এর পরিণতি হবে মারাত্মক।

একটি দেশ যে তার প্রতিবেশীর চেয়ে আয়তনে ৭ গুণ ছোট, এমন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলো যে, সে আত্মসমর্পণ করবে নাকি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করবে? আমি নিজেকে এই প্রশ্ন করি। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবো।

আমি পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছি না। এটি একটি আশঙ্কা। এটি জাতিসংঘের জন্য একটি পরীক্ষা। জাতিসংঘ‌ই কাশ্মীরের জনগণের নিজেদের পছন্দ বেছে নেয়ার অধিকারের গ্যারান্টি দিয়েছিল। ১৯৩৯ সালের মতো এটা কি সঠিক সময় নয়?

এটাই সময়, পদক্ষেপ নেয়ার এটাই সঠিক সময়। এবং প্রথম একশন হবে ভারতকে অবশ্যই কাশ্মীরে হিউম্যান কারফিউ তুলে নিতে বাধ্য করা হবে যেটি গত ৫৫ দিন ধরে চলমান। ১৩ হাজার কাশ্মীরী বালককে মুক্ত করতে হবে।


কাশ্মীরের জনগণের আত্ম অধিকার প্রতিষ্ঠা করার এটাই উপযুক্ত সময় জাতিসংঘের জন্য। ধন্যবাদ।