কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক এবং বিজেপি থেকেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল

কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক এবং বিজেপি থেকেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল

৫ আগস্ট ২০১৯ তারিখে ভারতের নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫(এ) ধারা পার্লামেন্টের দুই পক্ষের ভোটে বাতিল করেছে।

এর মাধ্যমে ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল তা বাতিল করা হয়েছে এবং কাশ্মীরকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এ দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। তারা এই পদক্ষেপ হঠাৎ করে গ্রহণ করেনি।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেসের নেতা জওহরলাল নেহেরু কাশ্মীরে যে ফ্যাসিস্ট প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তার ধারাবাহিকতাতেই এখন নরেন্দ্র মোদি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং তাকে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করেছে।

এর ফলে কাশ্মীরকে তারা পরিপূর্ণভাবে গ্রাস করে ভারতের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে এবং তাদের সব আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে শিকেয় তুলেছে।

জওহরলাল নেহেরু কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে গণভোটের সব সম্ভাবনা শেষ করে তাকে একটি ভারতশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেছিল।

পরবর্তীকালে ভারত সরকার কাশ্মীরে যে নীতি কার্যকর করে এসেছে তার ধারাবাহিকতাতেই এখন নরেন্দ্র মোদির পক্ষে সম্ভব হয়েছে কাশ্মীরকে পরিপূর্ণভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা।

জওহরলাল নেহেরু তাদের নৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক অনেক হামবড়া কথাবার্তা সত্ত্বেও মূলত ছিল একজন ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বেই কংগ্রেস কাশ্মীরে তাদের সাম্প্রদায়িক নীতি কার্যকর করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, তার অনিবার্য পরিণতিই ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকারের পক্ষে বর্তমান পদক্ষেপ গ্রহণে।

এদিক দিয়ে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। তারা উভয়েই হিন্দুত্ববাদী নীতির ভিত্তিতে তাদের কাশ্মীর নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার। ১৯২৫ সালে আরএসএস প্রতিষ্ঠা করে গোলওয়ালকার। তার আগে সাভারকার হিন্দুত্ববাদের ওপর প্রথম তত্ত্ব খাড়া করে। সে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদী সরকারকে আখ্যায়িত করে হিন্দুদের লিবারেটর বা পরিত্রাতা হিসেবে।

তার মতে পুরো মুসলিম শাসন ছিল হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস। এজন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে তার কোনো বক্তব্য ছিল না। উপরন্তু সে ছিল তাদের এক ধরনের সমর্থক। তবে সন্ত্রাসবাদী আচরণের কারণে ভারতীয় ব্রিটিশ সরকার তাকে কিছুদিন আন্দামানে বন্দি রাখে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কংগ্রেস সরকার এজন্য আন্দামানের সেলুলার জেলে তার সম্মানে ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক স্মৃতিফলক স্থাপন করে! এই ছিল সাভারকারের প্রতি কংগ্রেস সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, গান্ধীর হত্যার পর তার অন্যতম চক্রান্তকারী হিসেবে সরকার তাকে বন্দি করে। আরএসএসকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু অল্পদিন পরই তারা সাভারকারকে মুক্তি দেয় এবং আরএসএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। শ্যামাপ্রসাদ ছিল হিন্দু মহাসভার সভাপতি। তাকে জওহরলাল নেহেরু তার সরকারের মন্ত্রী করে! এর থেকে বোঝার অসুবিধে নেই যে, কংগ্রেস তার ঢাকঢোল পেটানো অসাম্প্রদায়িকতা সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে হিন্দু মহাসভার বিরোধী ছিল না।

অথচ আরএসএস গঠিত হওয়ার আগে থেকে হিন্দু মহাসভাই ১৯৪৭ সাল এবং তার পরও ছিল হিন্দুত্ববাদের প্রধান ধারক-বাহক। ১৯৯২ সালে আরএসএসের করসেবকদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কোনো বিরোধিতা কংগ্রেস সরকার করেনি।

তারা ইচ্ছা করলেই সামরিক বাহিনী বা পুলিশ দিয়ে সে সময় বাবরি মসজিদের এলাকা ঘেরাও করে রাখতে পারত, তাহলে আর মসজিদ ধ্বংস করা সম্ভব হতো না। এ সময় কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও পরিস্থিতি মোকাবেলার কোনো চেষ্টা না করে সারাদিন তার বাড়ির পুঁজোর ঘরে কাটায় এবং বের হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজ শেষ হওয়ার পর!

এর থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, শুধু আরএসএসই নয়, কংগ্রেস সরকারও ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পক্ষে। এখানে মাত্র কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হল। কিন্তু দেখা যাবে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর প্রতি তাদের নরম দৃষ্টিভঙ্গি।

কার্যত তারা তাদের সাম্প্রদায়িক নীতিই কার্যকর করে হিন্দুত্ববাদের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এর থেকে এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য যে, কংগ্রেস নিজেও ছিল একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল এবং প্রকৃতপক্ষে তারা এবং হিন্দু মহাসভা, আরএসএস ছিল একই পালকের পক্ষী।

জওহরলাল নেহেরু প্রথম থেকে কাশ্মীরে যে নীতি অনুসরণ করে সেটা ছিল তাদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রতিফলন। এ কারণে ভারত বিভক্ত হওয়ার সময় কাশ্মীরকে নিয়ে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তাতে তারা সেখানে গণভোটের জাতিসংঘ প্রস্তাবের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত নেহেরু গণভোটের বিষয়টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও বাতিল করে।

গণভোট বাতিল করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির মধ্যে নেহেরু যে পরিবর্তন এনেছিল তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সরকার এখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজ করে সে অঞ্চলটিকে পুরোপুরিভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এখন ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের চরিত্রের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই সরকারের সঙ্গে ভারতীয় কর্পোরেট হাউসগুলো যেভাবে একীভূত হয়েছে এমনটা ইতিপূর্বে আর দেখা যায়নি, যদিও কংগ্রেস সরকারও এই কর্পোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেছে। নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই কর্পোরেট হাউসগুলোর সঙ্গে তার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

২০০২ সালে গুজরাটে এক ভয়ঙ্কর মুসলিমবিরোধী কর্মসূচির মাধ্যমে মোদি সরকারের আমলে চক্রান্তমূলকভাবে অসংখ্য মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল।

তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সারা বিশ্বে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছিল নরেন্দ্র মোদির বিরোধী। ২০০২ সালের পর তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করলে তার আবেদন তারা প্রত্যাখ্যান করে।

তাকে তারা কোনো ভিসা দেয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, নরেন্দ্র মোদিকে ভিসা না দেয়ার বিরুদ্ধে ভারতের তৎকালীন অসাম্প্রদায়িককংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সরকারিভাবে প্রতিবাদ করে। এসব থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার ভারতে অসাম্প্রদায়িককংগ্রেস সরকারেরই পরবর্তী সংস্করণ।

জাতীয় সংগীত স্থায়ী কোন বিষয় নয়, পরিবর্তনশীল।

জাতীয় সংগীত স্থায়ী কোন বিষয় নয়, পরিবর্তনশীল।

জাতীয় সংগীত অপরিবর্তনীয় বলে কোনো আইন নেই।
রবিন্দ্র লিখিত শিরকী ' আমার সোনার বাংলা' লেখা নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে লেখা এ গান দ্বীন ইসলাম উনার তাহযীব-তমাদ্দুন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী। রবিন্দ্র দেশকে তার কথিত মা কালী, দুর্গার প্রতিরুপ বিবেচনা করে দেবীবন্দনা করে লিখেছে। বাংলাদেশে রবিন্দ্র লিখিত আমার সোনার বাংলার ২৫ লাইনের প্রথম ১০ লাইন পাঠ করানো হয়।
এ গান আগাগোড়াই শিরকী ভরপুর। অথচ আজকে মুসলিম এই দেশে মুসলমান সে শিরকি লেখা পাঠ করে থাকে। এমনকি মাদরাসায় পাঠ করতে বাধ্য করানো হচ্ছে! নাউযুবিল্লাহ। 
যার কারনে ৯৮ ভাগ মুসলিম এই দেশে শিরকী ' আমার সোনার বাংলা' নামক জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের জোর দাবী উঠেছে। কিন্তু প্রশাসন জনগনের মতকে তোয়াক্কা না করে জাতীয় সঙ্গীত নামক শিরকী লেখা বহাল রেখেছে।
যদিও বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংগীতবদলে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলরাজনৈতিকভাবেই প্রস্তাব আনা হয়েছিল 'আমার সোনার বাংলা' লেখাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে চালু করার।
জাতীয় সংগীত প্রথম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. দ্বীন মুহম্মদকে ওই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। কমিটিকে বলা হয় এক মাসের মধ্যে নতুন কোনো সংগীতকে জাতীয় সংগীতহিসেবে প্রস্তাব করতে।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিকরা বলছেন, দ্বীন মুহম্মদ কমিটি এ বিষয়ে তিনটি বৈঠক করে। সে কমিটি দুটো গানের একটিকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে প্রতিবেদন জমা দেয়। গান দুটো হলো, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চল চল চলএবং ফররুখ আহমেদের পাঞ্জেরীকবিতা।
জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দ্বিতীয় উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৭৯ সালের ৩০ এপ্রিলে। সে সময় ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান।
ওই সময়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এক গোপন চিঠিতে লেখেন, ‘রবীন্দ্রর লেখা একটি গান ভারতীয় জাতীয় সংগীত। সে বাংলাদেশের নাগরিক নয়আমার সোনার বাংলা গানটি আমাদের সংস্কৃতির চেতনার পরিপন্থী বিধায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তন আবশ্যক।
ওই চিঠিতে আমার সোনার বাংলার পরিবর্তে প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করেন শাহ আজিজুর রহমান।কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের নিহত হলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। পাথরে চাপা পড়ে সেই নিদের্শনা।
জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের তৃতীয় দফার উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০১-২০০৬ সালে ২০০২ সালের ১৯ মার্চ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি যৌথ সুপারিশপত্র প্রধামন্ত্রীর কাছে জমা দেয়
স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, 'সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের দ্বীন ইসলাম উনার মূল্যবোধ ও চেতনার আলোকে জাতীয় সংগীত সংশোধিত হওয়া প্রয়োজন'তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এই অনুরোধপত্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠান।কিন্তু সেই সরকারের আমলেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। এরপর এ সম্পর্কে আর কোনো তৎপরতা নথিতে পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সংগীত অপরিবর্তনীয় বলে কোনো আইন নেই। বিভিন্ন দেশে জাতীয় সংগীত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। যেমন-
ইরাক : সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ২০০৪ সালে নতুন একটি সংগীতকে ইরাকের জাতীয় সংগীত হিসেবে সাময়িকভাবে নির্বাচিত করা হয়। তারা এখনও নতুন জাতীয় সংগীত খুঁজছে।
আফগানিস্থান : আফগান জাতীয় সংগীত এখন পর্যন্ত কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে।
জার্মানি: দেশটির সমতা বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টিন রোজে-ম্যোরিং জাতীয় সংগীতে আরও বেশি লিঙ্গ সমতা আনার প্রস্তাব করেছে৷ সে গানের যে অংশে ফাটারলান্ডঅর্থাৎ পিতৃভূমিবলা হচ্ছে, সেখানে হাইমাটঅর্থাৎ জন্মভূমিলেখার প্রস্তাব দিয়েছে৷
অস্ট্রিয়া: ২০১২ সালে অস্ট্রিয়ার জাতীয় সংগীতে ছেলেরা’-র জায়গায় মেয়েরা এবং ছেলেরালেখা হয়৷
ক্যানাডা: উত্তর অ্যামেরিকার এই দেশটিও সম্প্রতি তাদের জাতীয় সংগীতকে আরও নিরপেক্ষ করেছে৷
নেপাল: ২০০৮ সালে নেপালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়৷ তার আগের বছর নেপালে নতুন একটি গানকে জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি দেয়।
রুয়ান্ডা: গণহত্যা পরবর্তী রুয়ান্ডার ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে দেশটি ২০০১ সালে একটি নতুন জাতীয় সংগীত বেছে নেয়৷
দক্ষিণ আফ্রিকা: দেশটি ১৯৯৭ সালে আগের দুটি জাতীয় সংগীত থেকে কিছু অংশ নিয়ে নতুন একটি জাতীয় সংগীত তৈরি করে৷ আফ্রিকান্স ও ইংরেজি ভাষায় গানটি রচিত৷ তবে আফ্রিকান্স ভাষার অংশটি বর্ণবাদ আমলে ব্যবহৃত জাতীয় সংগীতের অংশ হওয়ায় এর সমালোচনা করে অনেকে৷ নেলসন ম্যান্ডেলা সেটি রিকনসিলিয়েটরি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল৷
রাশিয়া: ভ্লাদিমির পুটিন ২০০০ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ১৯৯০ সালের আগে ব্যবহৃত জাতীয় সংগীত ফিরিয়ে আনে৷ তবে গানের কথায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়৷ ১৯৯০ সালে যে জাতীয় সংগীত গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে কোনো কথা না থাকায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া অ্যাথলিটরা এর সমালোচনা করেছিল৷ তাদের বক্তব্য ছিল, কথাবিহীন গান তাদের নাকি উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি৷
তার মানে চাইলেই জনগণের মতামতকে মুল্যায়ন করে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা যায়। যেহেতু মুসলমান উনারা চাচ্ছেন ইসলামবিদ্বেষী রবিন্দ্র লিখিত শিরকী 'আমার সোনার বাংলা' পরিবর্তন করে দ্বীন ইসলামভিত্তিক লেখা জাতীয় পাঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে, সেহেতু সরকারকে অবশ্যই শিরকী, দেবী বন্দনায় ভরপুর 'আমার সোনার বাংলা' গান বাতিল ঘোষনা করে  দ্বীন ইসলামভিত্তিক লেখা জাতীয় পাঠ হিসেবে ঘোষনা করতে হবে।

গান্ধীর হিন্দুত্ববাদ এবং পাখতুন গোষ্ঠিগুলোর হিন্দু শাসকের উপর আক্রমনের কারন

গান্ধীর হিন্দুত্ববাদ এবং পাখতুন গোষ্ঠিগুলোর হিন্দু শাসকের উপর আক্রমনের কারন

হামীদ মীরের লেখা --

ব্রিটিশ লাইব্রেরি লন্ডনে আমি ভারত বিভক্তি সম্পর্কে যে সত্য (তথ্য ভাণ্ডার) পেয়েছি তা পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ইতিহাস গ্রন্থে পাইনি। আমি কয়েক বছর হলো ব্রিটিশ লাইব্রেরির সদস্য । লন্ডনে গেলে সুযোগ পেলেই ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডবিভাগে গিয়ে বসে পরি। খুঁজলে সেখানে অনেক কিছুই পাওয়া যায়।



কয়েকদিন আগে একবার ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এবার আমি ট্রান্সফার অব পাওয়ারশিরোনামে একত্রিত নথিগুলো খুঁজে দেখি। সেখানে অবিভক্ত ভারতের সাবেক ভাইস-রয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন-এর একটি গোপন চিঠি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এটা অবশ্য গোপন চিঠি ছিল না। চিঠিটি ১২ জুলাই ১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধিকে লেখা হয়।

চিঠিতে সে লিখে, "আপনি কাশ্মীরে যাওয়ার ঝুঁকি নেবেন না। কেননা মহারাজা হরি সিং সেখানে মুসলিগ নেতৃবৃন্দকে আসতে বাধা দিয়েছে। যদি আপনি মহারাজাকে কোনো বার্তা পৌঁছাতে চান তবে আমার মাধ্যমে পাঠাতে পারেন"।

কিছুদিন পর মাউন্ট ব্যাটেন শ্রীনগরে নিজের অধীনস্থ অফিসারের কাছে একটি গোপন টেলিগ্রাম পাঠায়। ২৮ জুলাই ১৯৪৭ সালে পাঠানো গোপন টেলিগ্রামে বলা হয় "জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাক-কে বলে দেবে, আমি গান্ধি ও নেহেরুকে কাশ্মীর পাঠাচ্ছি। যেই আসুক সে যেন তাকে মহারাজার সাথে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেয়"। 
এই টেলিগ্রাম পড়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, মাউন্ট ব্যাটেন মোহাম্মদ আলি জিন্নাহকে কেন শ্রীনগর যেতে দিল না। অথচ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দকে নিজেই সেখানে পাঠাল।

১ আগস্ট গান্ধি শ্রীনগর যায় এবং মহারাজা হরিসিংকে চাপ দেয় যেন সে ভারতের সাথে যুক্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কেন ভারত-পাকিস্তানের সাথে যুক্ত না হয়ে স্বাধীন থাকার পক্ষে ছিল? সে আশঙ্কা করেছিল মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ভারতের সাথে যুক্ত হলে বিশৃংখলা শুরু হতে পারে। 
কিছুদিনের মধ্যেই মহারাজা প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করল। তার স্থলে মেহের চান্দ মহাজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিল। সে দায়িত্ব গ্রহণ করেই সরকারের মুখ্যসচিব, আইজিসহ অন্যান্য বাহিনী প্রধানদের বদলি করল। আরএসএস-এর প্রকাশ্য সহযোগিতা করতে শুরু করল। এরপর পরিণতি তাই হলো রামচন্দ্র কাক যার আশঙ্কা করেছিল। মাউন্ট ব্যাটেন, গান্ধি ও মহারাজার সম্মিলিত চক্রান্তে জম্মুর মুসলমানের সঙ্গে এমন আচরণ করা হলো যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া ভার।

ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, অক্টোবর ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মীরের শাসকদের উপর পাখতুন গোষ্ঠিগুলোর হামলার পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। তাহলো,-

এক. সেরহিন্দে হজরত মুজাদ্দিদ আলফে সানি রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মাজারের অসম্মান করা হয়েছে। ১১ অক্টোবর কাবুলস্থ ব্রিটিশ দূতাবাসের সামরিক এ্যাটাচে লন্ডনে সংবাদ দেয় হজরত সাহেব শোরবাজারের ছেলে গজনি ও লগরের উদ্দেশে সফর শুরু করেছেন এবং সেরহিন্দে হজরত মুজাদ্দিদ আলফে সানি রহমতুল্লাহি আলাইহি- এর মাজারের যে অসম্মান হিন্দু ও শিখরা করেছে তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন।

দুই. 
পুঞ্জ এলাকায় সুধন গোত্রের অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসাররা দুগরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আর সুধনদের সাধুদের ( ﺳﺪﻭﺯﺋﯿﻮﮞ ) সাথে সম্পর্ক ছিলো। কেননা দুটি পক্ষই ছিলো পাঠান। জম্মু সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রী মেহের চান্দ মহাজন জম্মুর মুসলমানদের হত্যার আয়োজন করল। আরএসএস-এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিদের সামরিক উর্দি পরিয়ে দিল। তারা মুসলমান পুলিশ অফিসারদের হত্যা শুরু করলো। ফলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লো এবং আত্মরক্ষার জন্য উপজাতি সৈন্যরা কাশ্মীরে আক্রমণ করলো।

আজাদ কাশ্মীরের সাবেক প্রধান সর্দার মুহাম্মদ ইবরাহিম খান তার বই দে কাশ্মীর সাগা’-তে লিখেছেন, কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার পরিকল্পনা জুলাই ১৯৪৭ সালেই তৈরি হয়েছিল। পুঞ্জ ও গিলগিট বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ হওয়ায় আরএসএসকে উর্দি পরিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়। তাদের মুসলমাদের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া হয়। আরএসএস দুরগা বাহিনীর সাথে মিলে ২০ অক্টোবর ১৯৪৭ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৪৭ পর্যন্ত সোয়া দুই লাখ মুসলমানকে শহিদ করে। সেদিনটিকে স্মরণ করেই ৬ নভেম্বরে জম্মুতে শহিদ দিবস পালন করা হয়।

এ সময় পূর্ব পাঞ্জাব থেকে আগত মুহাজিরদের উপরও প্রচণ্ড অত্যাচার ও নিপীড়ন হয়। কিন্তু কাশ্মীরের মুসলমান ও সেখানকার মুসলিম নারীদের উপর যে অত্যাচার হয়েছে তা মানুষের কল্পনারও অতীত।

আমি কবরের লাশ উঠানোর পক্ষে নই। তবে নতুন প্রজন্মের জানা আবশ্যক ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বাধীনতা অর্জন করতে কি পরিমাণ রক্ত ও ত্যাগের প্রয়োজন হয়েছে। কতো জীবন দিতে হয়েছে স্বাধীন ভূ-খণ্ড লাভ করার জন্য। কতো নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে তা আমরা পেয়েছি তাও জানা প্রয়োজন।

আজাদ কাশ্মীরের সাবেক বিচারক মুহাম্মদ ইউসুফ সাররাফ তার কাশ্মীরিজ ফাইট ফর ফ্রিডমবইতে কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা লিখেছেন। তিনি জম্মুর মুসলমানের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘটনা নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি তার বইয়ে আতা মুহাম্মদ নামক এক ব্যক্তির ঘটনা লিখেছেন। তিনি পেশায় মিস্ত্রি ছিলেন। তিনি জম্মুর মস্তগড়ে বাস করতেন। ঈদের দিন আতা মুহাম্মদ বুঝতে পারলেন হিন্দুরা তার তিন মেয়েকে অপহরণ করে ধর্ষন করবে। তিনি মেয়েদেরকে নিজ হাতে হত্যা করলেন। যাতে তাদের ইজ্জত লুণ্ঠনের সুযোগ না পায়। এই ঘটনা দেখে তার ছোট ছেলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে বসে।

ইউসুফ সাররাফ লিখেন, জম্মু, কাঠুয়া, উদমপুর ও রিয়াসি এলাকায় দুই লাখ মুসলমান হত্যা করা হয়। ২৫ হাজারের বেশি মুসলিম নারীকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত নারীদের হিন্দু ধর্মগ্রহণ করতে চাপ দেয়া হতো। যে গ্রহণ করতো সে বেঁচে যেতো আর না হলে তাকে হত্যা করা হতো। মুসলিম নারীদের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রাখা হতো। কোথাও কোথাও তাদের আত্মীয়দের গোশত রান্না করে সামনে দিয়ে বলা হতো প্রিয় মানুষের গোশত ভাত দিয়ে খাও।©️

কাশ্মিরের মুনাফিক শেখ আবদুল্লাহ মতিলাল নেহরুর অবৈধ সন্তান

কাশ্মিরের মুনাফিক শেখ আবদুল্লাহ মতিলাল নেহরুর অবৈধ সন্তান

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীভারতে বিজেপি সরকার কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে দিয়েছে। বিজেপির প্রতিটি নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে ৩৭০ ধারা বাতিলের কথা সন্নিবেশিত থাকতো। প্রথমবার বিজেপি সরকার গঠন করেছিল অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বে। দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে।

সংবিধান প্রণয়নের সময়ও হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ৩৭০ ধারার বিরোধিতা করেছিল। তখন ৩৭০ ধারায় কাশ্মিরে কোনও ভারতীয় প্রবেশ করতে হলে পারমিট ভিসার প্রয়োজন হবে বলেও উল্লেখ ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে লোকসভার সদস্য মাওলানা হাসরাত মোহানীর সংশোধনী প্রস্তাবের কারণে পারমিট প্রথা বাতিল হয়েছিল।

সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কাশ্মিরে তার সমর্থক কিছু লোক নিয়ে ৩৭০ ধারার বিলুপ্তির দাবিতে পদযাত্রা করেছিল। ঝিলাম অতিক্রম করার পর যখন শ্যামাপ্রসাদ কাশ্মিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন শেখ আবদুল্লাহর সরকার তাকে গ্রেফতার করেছিল। একটা ডাকবাংলোতে তাকে অন্তরীণ করে রেখেছিল। অন্তরীণ অবস্থায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মৃত্যু হয়।

৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে থেকে বিজেপি তাদের পিতামহ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির আত্মত্যাগ সম্পর্কে কখনও বিস্মৃত হয়নি। বিজেপি মনে করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে শেখ আবদুল্লাহ সরকার হত্যা করেছিল। সুতরাং বিজেপি তাদের পিতামহের এ দাবি পূরণের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। সোমবার ৫ আগস্ট ২০১৯ তারা তাই করেছে।

জম্মু, কাশ্মির, লাদাখএতদিন এই তিন অঞ্চল নিয়ে ছিল কাশ্মির রাজ্য। লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত। কাশ্মির ছিল শতাংশে মুসলমান অঞ্চল। আর জম্মুতে হিন্দু, মুসলমান, শিখসহ মিশ্র জনসংখ্যা অঞ্চল, তবে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ অঞ্চলটা ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ শাসনের এলাকাভুক্ত ছিল। কিন্তু ১৮৪৬ সালে ইংরেজরা পঁচাত্তর লাখ রুপির বিনিময়ে গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়। সে থেকে ডোগড়া রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারত বিভক্তির সময় হরি সিং ছিল ডোগড়াদের শেষ রাজা।

ভারত বিভক্তির সময় কাশ্মিরে শেখ আবদুল্লাহর কাশ্মির ন্যাশনাল কনফারেন্স ছিল জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। শেখ আবদুল্লাহ ন্যাশনাল কনফারেন্সের বর্তমান সভাপতি ফারুক আবদুল্লাহর পিতা। তখন কংগ্রেস, মুসলিম লীগের তেমন উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব কাশ্মিরে ছিল না। শেখ আবদুল্লাহ নিজেকে কাশ্মিরের জিন্নাহ মনে করত। শেখ আবদুল্লাহ পরিবারের সঙ্গে নেহরু পরিবারের সম্পর্ক ছিল কয়েক পুরুষ ধরে। মোরারজি দেশাই তো তার মোরারজিস পেপারনামক গ্রন্থে শেখ আবদুল্লাহকে মতিলাল নেহরুর অবৈধ সন্তান বলে উল্লেখ করেছে।

মহারাজ হরি সিং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগত। আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত সে কি পাকিস্তানের যোগ দেবে না ভারতে যাবে সে সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি। অ্যালান ক্যাম্পবেল জনসন ছিল বড়লাটের সেরেস্তার উচ্চপদস্থ কর্মচারী। সে প্রত্যক্ষভাবে ভারত বিভাগের সঙ্গে জড়িত ছিল। অ্যালান ক্যাম্পবেল তার লিখিত গ্রন্থ মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’-এ হরি সিং এবং হায়দ্রাবাদের নিজাম সম্পর্কে লিখেছে, ‘যেমন কাশ্মিরের মহারাজ তেমনি হায়দ্রাবাদের নিজাম, বৃহৎ কোনও সংকটপূর্ণ অবস্থাকে প্রতিরোধ করার পন্থা জানে না। জানে শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে কালক্ষেপণ করা। তাদের রাজনৈতিক বুদ্ধির ভান্ডারে এই দীর্ঘসূত্রতার কৌশলশাস্ত্র ছাড়া আর কোনও অস্ত্র ছিল না।

কিন্তু তখন তো সেই কৌশল অবলম্বনের সময় ছিল না। কারণ পাঠান আর আফগান উপজাতির হাজার হাজার লোক কাশ্মিরের প্রবেশ করা শুরু করেছিল এবং তারা এত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল যে ২৮ অক্টোবর তারা রাজধানী শ্রীনগরে ৩৫ মাইলের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছিল। ডোগড়া ব্যাটালিয়ন তাদের প্রতিরোধ করতে পারছিল না।

কাশ্মির সম্পর্কে মাউন্টব্যাটেন এবং উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার প্যাটেলের কোনও অস্পষ্টতা ছিল না। তারা মনে করত এটা যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সুতরাং তারা পাকিস্তানে যোগদান করবে। সর্দার প্যাটেল লিয়াকত আলী খানকে বলেছিল 'নিজাম পাকিস্তানে যোগ দিতে চাচ্ছে আর হরি সিং চাচ্ছে ভারতে যোগদান করতে। সুতরাং এতে আমাদের হাতে উভয় রাজ্য একচেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে এবং আমরা তাই করব'।

কিন্তু নেহরু কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ। তার অভিলাষ ছিল কাশ্মির ভারতের সঙ্গে থাকুক। এরই মাঝে হরি সিং ভারতের কাছে সৈন্য ও সমরাস্ত্র সাহায্য চাইল। নেহরু সৈন্য পাঠাতে উতলা হয়ে উঠল, কিন্তু গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন বলল 'হরি সিং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগদান না করলে ভারতের সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি তিনি অনুমোদন দিতে পারবে না'।

হরি সিং ভারতে যোগদানের কথা ঘোষণা দেওয়ার পর গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন সৈন্য পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছিলে এই শর্তে, কাশ্মিরে শান্তি ফিরে এলে গণভোটের আয়োজন করতে হবে এবং রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। জাতিসংঘ বিরোধ মেটানোর জন্য গণভোটের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল।

ভারতের অনেক নেতা সেদিন গভর্নর জেনারেলের গণভোটের প্রস্তাব গ্রহণ করতে চায়নি। তখন ক্যাম্বেল তার বইতে লিখেছে মাউন্টব্যাটেন নাকি নেহরুকে বলেছিল, ‘ভণ্ডামি করে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না।কাশ্মির নিয়ে নেহরুর ভণ্ডামির ইতি টেনে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার পর্দা তুলল। শেষ পর্যন্ত মাউন্টব্যাটেনের কথাই সত্য প্রমাণিত হবে—‘ভণ্ডামি করে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না

ভারত কখনোই প্রতিবেশী দেশের বন্ধু হতে পারে না। ( ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে )

ভারত কখনোই প্রতিবেশী দেশের বন্ধু হতে পারে না। ( ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে )

দেশের দুএকটা রাজনৈতিক দল এবং গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী যেই প্রতিবেশীকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে। রাষ্ট্র যেহেতু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সে রাষ্ট্রকে টিকে থাকার জন্য তার যেমন শত্রæ-মিত্র চেনা দরকার। রাষ্ট্র থাকলেই ব্যবস্থা-বাণিজ্য, বিদ্যা-শিক্ষা, আয়-উন্নতি হওয়ার কথা। ফলে একটা বৃহৎ প্রতিবেশী যে বন্ধু নয়, সেটা বুঝতে পারা একটা ভীষণ রাজনৈতিক সাফল্য।

কেননা তিস্তা নদীসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্য হিসা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তার কোনোটিই হয়নি। তিস্তা চুক্তি হয় হয় করেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। ভারতের কিছু কিছু মিডিয়া যারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী তারা এবং এখানেও (বাংলাদেশে) কেউ কেউ মিনমিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছে, যে মমতা ব্যানার্জি নাকি এটা করতে দিচ্ছে না। 

আমরা সবাই জানি, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে অথবা সম্পর্ক নষ্ট করার ক্ষেত্রে অর্থাৎ তার পররাষ্ট্রবিষয়ক ব্যাপার কেন্দ্রীয় সরকারের জুরিসডিকশনই একমাত্র জুরিসডিকশন। সেখানে রাজ্যগুলোর কিছুই করার থাকে না।

এখানে খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গকে  আসলে কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজনৈতিক ও কূটনৈকিতকরা একটা উপলক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে বাংলাদেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করতে চায়। বছরের পর বছর যে রাষ্ট্র তার নিকটতম প্রতিবেশীকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ন্যায্য পাওনা দেয় না। তাকে বন্ধু মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ বাংলাদেশের মানুষ দেখে বলে আমার মনে হয় না।

শত্রুতার পর্যায়টা কোন পর্যায়ে আছে? যেটা প্রত্যক্ষ, একদিকে যখন দুই দেশের বন্ধুত্বের কথা হচ্ছে তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারত একের পর এক ডবিøউটিওর এন্টি ডাম্পিং কমিশনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। প্রথমে ব্যবহার করেছিল, ব্যাটারির ব্যাপারে, তারপরে ঝুট প্রোডাক্টের ব্যাপারে সর্বশেষ সফর শেষ হতে না হতেই হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ব্যাপারে তারা এন্টি ডাম্পিংকে প্রিটেক্স হিসেবে ব্যবহার করে। আর এসব তারা করছে সামান্য ব্যবসার জন্য।

যেখানে দুই দেশের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা আছে। এর মধ্যে ভারতই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। কোনোটা ৮ কোটি, কোনোটা একশকোটি টাকার ব্যবসা, সেগুলো বাধাগ্রস্ত করার জন্য এই আইনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করছে ভারত। ঐতিহ্যগতভাবে যেটাকে ট্যারিফ ব্যারিয়ার, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার।

অন্যদিকে ভারতের অকৃতজ্ঞতাও আছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ফরমাল ট্রেড আছে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার (৫৪ হাজার কোটি টাকা)। ভারতের ইনফরমাল ট্রেড ১১ বিলিয়ন ডলার পণ্যের বাজার বাংলাদেশে।

২০১৬-১৭ বাজেট ডকুম্যান্টস অনুযায়ী, অন্যান্য দেশের শ্রমিক-কর্মকর্তারা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেতন হিসেবে আপন আপন দেশে পাঠায়। তার মধ্যে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা) বাংলাদেশ থেকে ভারত লাভ করে।

প্রায় সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ভারত আয় করে থাকে। টাকার উৎস হিসেবেও বাংলাদেশ একটা বিরাট ঘটনা (সম্মান পাওয়া) ভারতের কাছে হওয়া উচিত। সাধারণত একজন ব্যক্তি প্রতিদিন যদি একজন কলা বিক্রেতার কাছ থেকে এক ডজন করে কলা কিনে, তাহলে ওই কলা বিক্রেতা সেই ক্রেতাকে দেখলে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কারণ তিনি ওই বিক্রেতার একজন নিয়মিত ক্রেতা। 

তিনি বিক্রেতার জীবন-জীবিকার সঙ্গেে জড়িত, তার অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। ভারত যেখান থেকে প্রতি বছর সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে, তার সঙ্গে যেই ধরনের সমীহপূর্ণ ব্যবহার করা উচিত, তা তো করেই না। বরং তারা সীমান্তে বছরের পর বছর আমাদের নাগরিকদের অন্যায়ভাবে হত্যা করে চলেছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম হচ্ছে চাণক্যপুরী। ভারতীয় কূটনৈতিক স্টাবিøশম্যান্ট এখনো হাজার বছর আগে সেই চাণক্যনীতি, যা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে। যেখানে পররাষ্ট্র নীতি কি হবে তা বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, তোমার আশপাশের যে ছোট ছোট রাষ্ট্র আছে তাদের দমন করে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখ। 

সেই আমলে তাদের জন্য কতটা সঠিক ছিল তা আমি জানি না। কিন্তু আজকের জামানায় যেখানে মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উত্থান ঘটেছে, আধুনিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ হয়েছে, জাতি রাষ্ট্রের উত্থান হয়েছে, বাংলাদেশে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আপন দেশ স্বাধীন করে তার মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠবার লক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে। সেখানে ভারত সারাজীবন যদি তার চাণক্যনীতিতে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাহলে এটা তার একটা অন্তর্গত সীমাবদ্ধতা। যেটা এই অঞ্চলে তাদের শত্রæতা তৈরি করা ছাড়া অন্যকিছু করতে পারবে না।

কারণ অন্য জাতিগোষ্ঠী, আশপাশের জনগোষ্ঠীকে ছোট করে দেখে, তাদের অবজ্ঞা করে, তাদের মর্যাদাবোধকে অসম্মান করে সে নিজে তাদের কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পাবে না। কিছু দালাল-টালাল সারা পৃথিবীতে পাবে। সভ্যতার প্রথম থেকেই সবদেশে কিছু দালাল থাকে। সেটি থাকতেই পারে কিন্তু তারা একটি জনগোষ্ঠীর মূল শ্রোতধারাকে-চিন্তা-ভাবনাকে কখনই প্রতিনিধিত্ব করে না। 

এই অঞ্চলে ভারতের যে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় অর্থনীতি, ভারত যদি তার চাণক্যনীতি বাদ দিয়ে আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতো। তাহলে ভারত এই অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে নেতাতে পরিণত হতো। যে দেশ নিজের অঞ্চলে স্বাভাবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক যোগ্যতা রাখে না, তার বিশ্ব নেতৃত্ব পাবার যত আকাক্সক্ষাই থাকুক তা পরিহার করতে হবে।