বিয়ের আগে বর কনের দ্বীনদারী তথা পরহেজগারীতা দেখেই বিয়ে ঠিক করতে হবে।


বিয়ে একটি নব পরিবারের সূচনা সিড়ি। একটি ছেলে একটি মেয়ের একত্রে বসবাসের যে সুখময় সংসার, তার আবশ্যক পূর্বশর্ত বিয়ে। আর নিছক ভোগচাহিদাপূরণের জন্য তো বিয়ে নয় বরং এ এক অমূল বন্ধন।  বিয়ে পরবর্তী জীবনে স্বামী-স্ত্রীরমধ্যকার সুন্নতি মধুময় সম্পর্ক অটুট রাখার ক্ষেত্রে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখনকার পরিবার গুলো ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিতে একপায়ে রাজি থাকে কিন্তু কার হক্ব কতটুকু তা বেশির ভাগই বেখবর।

যার দরুন দিনদিন পারিবারিক অশান্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্বি পাচ্ছে। সংসার ভাঙ্গনের হার এখন মুসলিম দেশ গুলোতেও ব্যাপক আকার ধারন করেছে। যেটা প্রকৃত মুসলমানের কখনও কাম্য নয়। সাধারন মানুষ তো দুরে থাক, বর্তমানে মাওলানা, মুফতি, ইমাম-খতিব তাদের মধ্যেও পারিবারিক বিভিন্ন ইলমের ঘাটতি থাকায় সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। সবাইকে জানতে হবে, সচেতন হতে হবে এ অমূল্য বন্ধন সম্পর্কে। কেননা বিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকটি দিন বা বছরের জন্য নয়। সারাজীবনের প্রশ্ন এখানে।

বিবাহ পরবর্তী সুখময় মধুর সম্পর্ক নিজেকে আল্লাহওয়ালা বা আল্লাহওয়ালী হতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। অপরদিকে আল্লাহ পাক না করুন কারও যদি অশান্তি সৃষ্টি হয় তাহলে আল্লাহওয়ালা বা আল্লাহওয়ালী হওয়া তো দুরের কথা নিজেকে জমিনে ঠিকিয়ে রাখা কঠিন কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। আর কারও যদি অশান্তি অবস্থায় সংসার টিকে থাকে তবে সন্তান-সন্তুতি ভালোভাবে বেড়ে উঠা কষ্টকার হয়ে যায়। সামান্য অজানা বা অসচেতন পুরো জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে রাখে।

বিয়ের পূর্বেই পাত্র-পাত্রী বা তাদের পরিবারগুলোকে মানসিক প্রস্তুতি ব্যাপকভাবে নিতে হবে। বিয়ের পর কোনও ঝামেলা হলে ছেলে বা মেয়ে ডিরেক্টলি তার মা-বাবাকে জানিয়ে দেয়, আমি তো এখন প্রস্তুত ছিলাম না। তোমরা বিয়ে দিয়েছে তোমরা দেখে নাও। তখন ফিৎনা দিন দিন বাড়তে থাকে। একসময় তালাকও দিয়ে ফেলে। অথচ দেখে যায় ফিৎনার বিষয়টা তেমন কিছু কঠিন বিষয় না। ছেলেটা বা মেয়েটা একটু সচেতন হলেই যথেষ্ট ছিলো। মুলত এখনকার পারিবারিক ফিৎনাগুলো সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করেই বেশি সৃষ্টি হয়।

অতএব পারিবারিক সম্প্রীতি বাড়ানোর জন্য বিয়ের পূর্বেই মানসিক প্রস্তুতি নেয়া জরুরী। কেননা হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “ প্রতিটি ভালো কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।বুখারী শরীফ। অর্থাৎ মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া জরুরী।

পরিবারের সদস্যদের সাথে সাংঘার্ষিক হয় এমন পরিবেশে রাখলে, তারপর জীবনভর দুজনের সংসারে লেগে থাকা মনোমালিন্যের দায়ভার পরিবারের কর্তা বা পাত্র কীভাবে এড়িয়ে যাবেন!  মেয়ের মুখ বুঁজে সব সয়ে যাওয়া মানে আল্লাহ পাক উনার কাছে পার পাওয়া নয়। সে হিসেব বড়ই কঠিন এবং শক্ত। কেননা পর্দার জন্য এবং ফিৎনামুক্ত  উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা কুরআন শরীফ-হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে ফরয। এ বিষয়ে পুরুষকে সহনীয় ভূমিকা রাখতে হবে। দায় এড়ানোর সুজোগ ইসলাম কাউকে দেননি।

আমরা মুসলমান। কুরআন শরীফ এবং হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে নারীদেরকে যে অভাবনীয় সম্মান দিয়েছেন, সেটা রক্ষা করতে হবে। নব পরিবারে ফিৎনা সৃষ্টি হবে এমন কোনও কাজ বা পরিবেশ রাখা যাবেনা। একটা মেয়ে সমস্ত কিছু ত্যাগ করে স্বামীর খেদমতে চলে আসেন। এখানে থাকেনা তার নিজস্ব পিতা-মাতা, ভাই-বোন বা আত্বীয়-স্বজন। একান্তই একটা অপরিচত জায়গায় তার আগমন ঘটে। আর একটা নতুন জায়গায় একটা মানুষ প্রথম আসলে তার অনেক কিছু বুঝতে বাকি থেকে যায়।

অতএব পরিবারে মধুময় সুখের সুন্নতি সংসারের জন্য ফিৎনামুক্ত এবং পর্দাবেষ্টিত পরিবেশ নিশ্চিত করা পুরুষের জন্য অবশ্যই দায়িত্ব-কর্তব্য।কেননা কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, ‘‘নারীদের তাদের পরিবারের অনুমতি নিয়েই তোমরা বিবাহ করো এবং তাদের অধিকারটুকু ভালোভাবে আদায় করে দাও।’’ (সূরা নিসা-২৫)
পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম উনার দৃষ্টিতে বিশেষ একটি গুণ দ্বীনদারী বা পরহেজগারী যাচাই করে দেখা আবশ্যক।
বিবাহের একটি অন্যতম গুণ হচ্ছে, ‘বর-কনের দ্বীনদার ও ধার্মিক হওয়া। এ সম্পর্কে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ‘চারটি গুণের কারণে একটি মেয়েকে(বা ছেলেকে) বিবাহ করার কথা বিবেচনা করা হয়।  তার ধন-সম্পদ, তার বংশ গৌরব-সামাজিক মান-মর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারী। কিন্তু তোমরা দ্বীনদার মেয়েকে(বা ছেলেকে) বিবাহ করে সফলতা অর্জন কর।’(বুখারী শরীফ)

উল্লেখিত হাদীস শরীফে চারটি গুণের মাঝে সর্বশেষ গুণটাই মূখ্য। প্রথম তিনটি গুণ বিদ্যমান থাকার পরেও যদি শেষের গুণ-দ্বীনদারী তথা পরহেজগারী না থাকে, তাহলে প্রথমোক্ত তিনটি গুণ মূল্যহীন হয়ে যাবে।  অর্থাৎ বর-কনের মধ্যে অবশ্যই দ্বীনদারী তথা পরহেজগারী থাকতে হবে। যদি বরের দ্বীনদারী না থাকে তাহলে পিতার কখনই ঠিক হবেনা মেয়ে দেয়া, আর যদি মেয়ের পরহেজগারী না থাকে তাহলে ছেলের উচিত হবেনা মেয়েকে গ্রহন করা। উভয় পরিবারকে মধুময় সুন্নতি সংসারের জন্য এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা লক্ষ রাখতে হবে। কোনও ভাবেই হালকা করে দেখার এতটুকু সুযোগ দেয়নি ইসলাম-এটা মনে রাখতে হবে।

 আরো হাদীস শরীফ উনার মধ্যে হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,- ‘তোমরা মেয়েদের (বা ছেলেদের) কেবল তাদের রূপ-সৌন্দর্য দেখেই বিয়ে করো না। কেননা, এ রূপ-সৌন্দর্য অনেক সময় তাদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাদের ধন-সম্পদের লোভে পড়েও বিয়ে করবে না। কেননা এ ধন-সম্পদ তাদের বিদ্রোহী ও অনমনীয় বানাতে পারে। বরং তাদের দ্বীনদারীর গুণ দেখেই তবে বিয়ে করবে। বস্ত্তত একজন দ্বীনদার  দাসীও(দাসও) অনেক ভাল। (ইবনে মাযাহ শরীফ)।

 পবিত্র কুরআন শরীফে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে, ‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে খুব ভাল ব্যবহার(সুন্নতি আচরন) ও সৎভাবে তথা দ্বীনদারীর সাথে বসবাস করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তাহলে হতে পারে যে, তোমরা একটা জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ পাক তার মধ্যে বিপুল কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। (সূরা ৪ নিসা, আয়াত শরীফ-১৯)

এখানে বর-কনে উভায়কে দ্বীনদারী বা শরীয়ত সম্মত বিধিবদ্ধ জীবন-যাপনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ জান্নাতের ছোয়ায়  থাকতে চাইলে পৃথিবীতে  নিয়ম-মাফিক শরীয়ত সম্মত জীবন-যাপন করতে হবে। তবেই না বাধাহীন চির সুখের সুন্নতী মধূময় সংসার পাওয়া  যাবে। কিন্তু আমরা এখন বিবাহ দেয় টাকা-পয়সা বা রুপ দেখে। ফলে আজকের সংসারে সুন্নতের কোনও প্রতিফলন ঘটছে না।
সঙ্গতকারনেই সেই সংসার গুলো ফিৎনায় পূর্ণ থাকছে । ছেলেমেয়ে কখনও নেক সন্তান হয়না। পিতা-মাতার কথা সন্তানরা ঠিকমত শুনেনা, যেমন পিতা-মাতা নিজেরাই এক অপরের কথাই আনুগত্য রাখেনা। আর একমাত্র দ্বীনদারী বা পরহেজগারী দ্বারাই সুখকর,জান্নাতি,মধুময়,শান্তির নীড় হবে নব দম্পত্তির সংসার। অন্যকোনও ভাবে কল্পনা করা যেতে পারে কিন্তু বাস্তবে সুখের হবেনা, হবে দু:খের নীড়।

অতএব বিয়ের আগে বর কনের দ্বীনদারী তথা পরহেজগারীতা দেখেই বিয়ে ঠিক করতে হবে। নইলে নই।


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট