মুসলমান নয়, অমুসলিমেরাই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী


সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলমানেরাই এখন এর প্রধান ভিকটিম। অথচ বিশেষ উদ্দেশ্যে এ জন্য মুসলমানদেরই দায়ী করা হয়। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ হুমকির মুখে পড়েছে- এমন উদ্ভট ও কল্পিত বিশ্বাস থেকে চালানো সর্বশেষ হামলায় গত ১৫ মার্চ ২০১৯ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা বিশ্বসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সন্ত্রাসবাদী ও বর্ণবাদী হামলার ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবই হয়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ঘটনার আদ্যোপান্ত পর্যালোচনায় এক ভয়াবহ চিত্রই বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে। যা বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

১) ২০১৫ সালের অক্টোবরে সুইডেনের ট্রোলহাটনের স্কুলে হামলায় নিহত হন তিনজন। এ হামলার লক্ষ্যবস্তুও ছিল মুসলমান। নিহতদের মধ্যে ছিল ১৫ বছর বয়সী আহমেদ হাসান। সোমালিয়ায় জন্ম নেয়া এই শিশুটি কয়েক দিন আগেই সুইডেনে এসেছিল।

২) ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কানাডার কুইবেক অঙ্গরাজ্যের এক মসজিদে সদ্য নামাজ শেষ করা মুসল্লিরা যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ২৯ বছর বয়সী বিসোনেত্তে নামের ব্যক্তি তাদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। বন্দুক হামলাকে প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হন আজেদাইন সৌফিয়ান নামে এক ব্যক্তি। ওই হামলায় আহত হন আরো ১৯ জন।

৩) ২০১৭ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ডে ছুরিকাঘাতে নিহত হন দুজন। অভিযুক্ত হত্যাকারী আদালত কক্ষে চিৎকার করে বলেছিল, ‘স্বাধীনভাবে কথা বলতে দাও নইলে মরো। তুমি একে সন্ত্রাসবাদ বলতে পারো, আমি এটাকে দেশপ্রেম বলব।একই বছরের জুনে যুক্তরাজ্যের ফিনসব্যুরি পার্কের বাইরে একটি মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের ওপর চালিয়ে দেয়া ভ্যানের চাপায় নিহত হন মুকাররম আলি ও অপর ১২ জন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, ড্যারেন অসবর্ন নামের হত্যাকারী ভ্যান হামলার পর চিৎকার করে বলেছিল, ‘আমি সব মুসলমানকে মারতে চাই-অল্প কয়েকজনকে মারলাম।

৪) ২০১৭ সালের জুনে পূর্ব লন্ডনের বেকটনে ব্রিটিশ মুসলিম মডেল রেশাম খান (২১) এবং তার চাচাতো ভাই জামিল মুখতারের (৩৭) ওপর এসিড হামলা হয়। এতে প্রচণ্ডরকমের দগ্ধ হন দুজনই। রেশাম ও জামিলের ওপর এসিড নিক্ষেপকে মুসলিমবিদ্বেষী হামলা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

বিশ্বব্যাপী একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে, বেশির ভাগ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী হামলার সাথে মুসলমানেরা জড়িত। কিন্তু চুলচেরা বিশ্লেষণে তা অসার বলেই প্রমাণিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার গবেষণার ফলাফলেও সে চিত্রই ফুটে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা সংস্থার জরিপের ফলাফলে দেখা দেছে, গত ১০ বছরে দেশটিতে শতকরা ৭১ ভাগ হামলার ঘটনার সাথে জড়িত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংস্থা অ্যান্টি-ডিফেম্যাশন লিগ সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যতগুলো সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর মধ্যে ৭১ শতাংশ চালিয়েছে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী ও আধিপত্যবাদীরা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বেড়েছে ৩৫ শতাংশ।

এ দিকে দ্য ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস অব অস্ট্রেলিয়া নামের স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।সিডনিভিত্তিক সংস্থাটির বৈশ্বিক সন্ত্রাসসূচক ২০১৮প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে (সারাবিশ্বে) উগ্র-ডানপন্থী দল ও ব্যক্তিরা ১১৩টি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। এতে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ জনের।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, শুধু ২০১৭ সালেই হামলা হয়েছে ৫৯টি। আর সে বছর মারা গেছেন ১৭ জন। ২০১৭ সালে ১২টি হামলা হয়েছে যুক্তরাজ্যে, ছয়টি সুইডেনে এবং গ্রিস ও ফ্রান্সে দুটি করে হামলা চালানো হয়েছে। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা হয়েছে ৩০টি। তাতে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। সংস্থাটির হিসাবে সেসব হামলার বেশির ভাগই পরিচালিত হয়েছে মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগে আক্রান্ত উগ্র-ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গদের দিয়ে।

মূলত ধর্মীয় সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো যেভাবে প্রচার হয় উগ্র-ডানপন্থীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সেভাবে প্রচার হয় না। এখন সে দিকটিতে নজর দেয়ার সময় এসেছে। কেননা, সব জায়গাতেই উগ্র-ডানপন্থীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। উল্লেখ্য, গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটি মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার সময় শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীদের হামলায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ইসলাম যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরোধী। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো মানুষকে হত্যা করার কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ (করার শাস্তি বিধান) ছাড়া (অন্য কোনো কারণে) কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল; (আবার এমনিভাবে) যদি কেউ একজনের প্রাণ রক্ষা করল তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকেই বাঁচিয়ে দিলো।’ (সূরা আল মায়িদা-৩২)

বস্তুত, ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীরা কখনোই বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি নয় বরং সংখ্যালঘু শ্বেতসন্ত্রাসীরাই এখন বিশ্বশান্তির জন্য প্রধান অন্তরায়। অথচ এসব অপরাধী থাকে নেপথ্যে। এরা কোনো ধর্মেরই প্রতিভূ নয় বরং সভ্যতা ও মানবতারই প্রতিপক্ষ।


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট