ফিলিস্তিনের ধ্বংসে আরব শাসকদের ভূমিকা



গাজায় প্রতিবারই ইসরায়েলের হামলার পর এক তামাশা শুরু হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। গাজায় ইসরায়েলের হামলার পরপরই মিসর অসম্ভব রকম দ্রুততায় যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। যেন মিসর গাজা বা ফিলিস্তিনের অভিভাবক। শুধু মিসরই না, আরবের অনেক দেশই নিজেদের ফিলিস্তিনের বন্ধু, জনদরদি প্রমাণের জন্য ফিলিস্তিন কার্ড ব্যবহার করে। বরাবরই আরবদেশগুলো যুদ্ধ শুরু করার জন্য হামাসকে দায়ী করে ইসরালেয়কে কাতর অনুরোধ করে যুদ্ধবিরতির জন্য।

কিন্তু নিকট অতীতে মিসরসহ অন্য আরবদেশগুলো ইসরায়েলকে সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী করেছে বলে দেখা যায়নি। ইসরায়েল নির্বিচারে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে বসতি স্থাপন করছে। অবলীলায় শিশু, অন্তঃসত্ত্বাসহ যুবকদের হত্যা করছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ করেনি। ইসরায়েল যদি যুদ্ধাপরাধী না হয়, তবে যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞাই বদলে যাওয়ার কথা।

সমগ্র আরব শাসকদের এতটাই অধঃপতন হয়েছে যে সবাই দল বেঁধে এখন ইসরায়েলকেই অনুরোধ করে ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে এরাই ইসরায়েল ও মার্কিনদের বিশ্বস্ত বন্ধু। ইসরায়েলের এই হত্যাযজ্ঞ, দখলদারির বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করে না। অবশ্য করার কোনো নৈতিক ভিত্তিও তাদের নেই। আরবের বেশির ভাগ শাসকই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নয়। এদের সবাই কমবেশি ক্ষমতা জবরদখল করে আছে। পশ্চিমারা নিজেদের স্বার্থ বজায় রাখতে এসব ক্ষমতা জবরদখলকারীকে সব সময়ই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

আরবের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা জবরদখলকারীদের শাসকদের সঙ্গে ভূমি জবরদখলকারীদের ইসরায়েলের একধরনের আঁতাত রয়েছে। তাই মিসরে আবদেল ফাত্তাহ সিসি ক্ষমতা দখল করেই গাজার রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এখানে গাজাবাসীর অবরুদ্ধ মানবেতর জীবনের চেয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সিসির কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলকে খুশি রাখতে পারলে সিসির ক্ষমতায় থাকা নিয়ে কোনো সংশয় থাকবে না। বাস্তবেও তাই হয়েছে। ইউরোপসহ পশ্চিমারা ইরান বা তুরস্কের নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্র নিয়ে যতটা উচ্চকিত, মিসরের বেলায় ততটাই বিস্ময়কর রকম নীরব।

ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার দায়িত্ব কে নেবে? আছে পশ্চিমাদের প্রতিনিধি লৌহমানবেরা, যাঁদের আচারআচরণে গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই।

এসব লৌহ শাসক নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ফিলিস্তিনকে বিকিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমাদের কাছে। এখানে দুই পক্ষই একে অপরকে ফ্রি রাইড দিয়েছে। আরবের জনসাধারণকে দমিয়ে রাখার জন্য এই ক্ষমতা জবরদখলকারীদের পশ্চিমের সুনজর প্রয়োজন। আবার ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই অবৈধ শাসকদের পশ্চিমাদের প্রয়োজন।

অন্যথায় জনসাধারণ ফুঁসে উঠলে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে যাবে। উভয়ের উভয়কে প্রয়োজন স্বার্থগত কারণে। এখানে মূল খেলা হচ্ছে আরবের স্বৈরশাসক ও পশ্চিমাদের মধ্যে। মাঝ থেকে ফিলিস্তিনের নিরীহ জনসাধারণ নির্মম একপক্ষীয় যুদ্ধের শিকার হচ্ছে।

অবশ্য দখলদারেরা কখনো শান্তিতে থাকে না। ইসরায়েলও খুব শান্তিতে নেই। যাদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হলো, বসতি থেকে উচ্ছেদ করা হলো, তারা বিনা প্রতিবাদে সব মেনে নেবেএটা নির্বোধেরাই ভেবে থাকে। এ জন্যই ফিলিস্তিনিরা জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার মহামিছিল অব্যাহত রাখে। পাথর নিয়েই এগিয়ে যায় মাতৃভূমি মুক্ত করতে। বরং ইসরায়েল প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা কি আর কাজ করছে না? মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি আয়রন ডোম ডিফেন্স সিস্টেম কি হামাসের মিসাইল রকেট থেকে ইসরায়েলের নাগরিকদের রক্ষা করতে পারছে না। অন্তত জেরুজালেম পোস্টের মার্চের শেষের দিকে এক সংবাদে এমনটিই বলা হয়েছে। ইসরায়েলের নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগেই হামাস তেল আবিব, শ্যারন ও এমেক হেফার শহরকে লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ করে।

শ্যারন ও এমেকের দখলদার অধিবাসীরা শেষ রাতের ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ওই ঘটনায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ তোলপাড় হয়ে যায়ে। এমনকি ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিভাগের মুখপাত্রকে এ নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। ইসরায়েলে নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে হয়েছে যে আয়রন ডোম ডিসেন্স সিস্টেমের কোনো হেরফের হয়নি বা ত্রুটিও নেই। কিন্তু এরপরও কি দখলদার ইসরায়েলের নাগরিকেরা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে পারছে। এ মাসের শুরুতেই হামাস ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরকে লক্ষ্য করে কমপক্ষে ৪০০ মিসাইল রকেট নিক্ষেপ করেছে। এ ঘটনায় ইসরায়েলের ছয়জন নাগরিক নিহত হয়েছে।

এরপরই শুরু হয় ইসরায়েলের গাজাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া পালা। গাজাবাসীর শবমিছিল দিন দিন বাড়ছেই। ইসরায়েলের হামলার বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। প্রতিদিনই শিশুদের এপিটাফের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে লেখা থাকছে, বিশ ও একুশ শতকে তথাকথিত মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রপন্থীদের সরাসরি সহায়তায় ও মদদে ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনের নিষ্পাপ শিশুরা এসব সমাধিক্ষেত্রে চিরশয্যা নিয়েছিল।

অথচ কেউই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনেনি। এহুদ বারাক, অ্যারিয়েল শ্যারন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কোনো ন্যুরেনবার্গ ট্রায়ালের আয়োজন করা হয়নি। আন্তর্জাতিক বিচারালয় এসব ঘটনা একেবারেই না দেখার ভান করে নিশ্চুপ ছিল।

ড. মারুফ মল্লিক, ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট