পানির যুদ্ধ, ফসলের যুদ্ধ - গত কয়েক দশকে ক্যান্সার সহ দুরারোগ্য ব্যাধি হবার কারণ কি? -১



পর্তুগীজদের জাহাজ যখন প্রথম এই সাবকন্টিনেন্টে এসে নোঙ্গর ফেলে তখন জাহাজের সামনে কামান সাজানো ছিল। কিন্তু পোর্টের অনেকেই এই কামান চিনতে পারেনি। কারণ সাধারণ জনগণ তখন কামানকি জিনিস এটা জানতো না। বাংলাদেশেও আমরা অনেকেই বর্তমানে পানি ও ফসলের দখলদারিত্বের বিষয়টা বুঝতে পারছি না। পর্তুগীজ সহ ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি শুরু করেছিল ব্যবসা দিয়ে শেষ করেছিল মসনদে বসে। এদেশে কিছু বহুজাতিক কোম্পানি শুরু করেছে ব্যবসা দিয়ে, শেষ করবে অন্যকিছু দিয়ে।

কয়েকদিন আগে ভারতে কৃষকদের বিরুদ্ধে বহুজাতিক কোম্পানি পেপসিকো কয়েক কোটি টাকার মামলা ঠুকে দেয়। কৃষকদের অপরাধ হল তারা পেপসিকোর পেটেন্ট করা আলু চাষ করেছিল। পরে প্রতিরোধের মুখে তারা এই মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। http://bit.ly/2PRqBii http://bit.ly/2vM5EvU

এই বিষয়ে বাংলাদেশে এনজিওর একজনের সাথে কথা বললাম। জানতে পারলাম, বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে সিনজেনটা নামক একটি কোম্পানি এই রকম পেটেন্ট ভিত্তিক বীজ সরবরাহ করছে। যেটা আসলে এক ফসলি বীজ। অর্থাৎ এই বীজ সাধারণ প্রচলিত বীজের মত কয়েকবার ব্যবহার করা যাবে না। মাত্র একবার ব্যবহার করা যাবে। ফলে কৃষকরা বীজ এর ক্ষেত্রে পেটেন্ট ভিত্তিক কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তখন দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কৃষিখাতের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই ঐ সকল কর্পোরেটদের হাতে চলে যাবে।

ভারতের অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট তিন লাখের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। এই সকল দখলদার কোম্পানিকে বাংলাদেশে একচেটিয়া ব্যবসা করতে দিলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষকরাও আত্মহত্যা করবে, এটা নিশ্চিত। http://bit.ly/2vxu2S4

অনেক সময় ভাল বিষয় ও খারাপ বিষয় বাইরে থেকে দেখতে একই রকম মনে হয়। যেমন, ভাল শরবত ও বিষ মেশানো শরবত দেখতে একই রকম হতে পারে কিন্তু একটা ভাল অন্যটাতে মৃত্যু ঘটতে পারে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। বাইরে থেকে দেখলে অনেক ব্যবসা-বিনিয়োগ ভাল মনে হয়, কিন্তু এগুলোর সবটাই আমাদের জন্যে ভাল এমন নয়।

মনসান্টোর একটি কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এক ব্যক্তি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার আইনজীবী মামলা দায়ের করেছিল। সেই মামলার রায়ে আমেরিকার একটি আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে ২৮৯ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে। এই সকল কোম্পানির পণ্য ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশেও ক্যান্সার, টিউমার সহ অন্যান্য ব্যাধির প্রকোপ যে একেবারেই হচ্ছে না তার নিশ্চয়তা কি? অনেকে হয়তো বলবেন যে, ক্যান্সার হয় এটা এখনও প্রমাণিত নয়। তাহলে ২৮৯ মিলিয়ন ডলার জরিমানা হল কেন? শুধু তথ্য গোপন করার জন্য? কি তথ্য? আরও একটু খতিয়ে দেখুন। পরের পর্বে এ বিষয়ে আরও আলোচনা করা হবে। http://bit.ly/2DFiIrm https://reut.rs/2H9H9zy

এই সকল কোম্পানির কীটনাশকগুলো যেহেতু মাটি ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়, এরা মানুষের শরীরে নানা প্রকার রোগ ব্যাধি যেমন ক্যান্সার, নিউরো-লজিক ও হরমোনাল ডিসঅর্ডার, জন্মগত সমস্যা ইত্যাদি সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই সকল কোম্পানির কীটনাশকের কারণে খোদ আমেরিকাতেই ৬ থেকে ১২ বছরের শিশুদের মাঝে অতি উচ্চ মাত্রায় ক্লোরপাইরিফস ও মিথাইল প্যারাথিয়ান পাওয়া গেছে যেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। [মার্চ এগেইন্সট সিনজেনটাঃ মনসান্টো'স সুইস টুইন আনমাস্কড]

শুধু তাই নয়, এইসকল কোম্পানির কীটনাশকগুলি নদী ও সমুদ্রের জন্যেও ক্ষতিকর। ২০০৭ সালে ন্যাশনাল ওশান ও এটমোস্ফেরিক এডমিনিস্ট্রেশন এর গবেষণায় দেখা যায় যে এই কীটনাশকগুলি সামুদ্রিক ফাইটোপ্লাঙ্কটনের জন্যে ক্ষতিকর। আর সামুদ্রিক অনেক প্রাণী ও মাছের খাদ্য এই ফাইটোপ্লাঙ্কটন। মোদ্দা-কথা, সিনজেনটা ও মনসান্টো কোম্পানির ফলে শুধু যে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে তাই নয়, সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্যও ক্ষতির সম্মুখীন। [মার্চ এগেইন্সট সিনজেনটাঃ মনসান্টো'স সুইস টুইন আনমাস্কড]

সিনজেনটা কোম্পানিটি মূলত মনসান্টোর মতই সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক আরেকটি সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানি। খোদ সুইজারল্যান্ডেই এই কোম্পানির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। এই কোম্পানি বিক্রি হয়ে যায় কেমচায়নার কাছে (আমেরিকার মনসান্টোকে কিনে নেয় জার্মান কোম্পানি বেয়ার)। এর পর আমেরিকায় এই সিনজেনটা কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হয়। সিনজেনটা ১.৫১ বিলিয়ন ডলার প্রদানে রাজি হলে মামলার নিষ্পত্তি হয়। http://bit.ly/2VkzzdT http://bit.ly/2PQIOMY

এই সকল কৃষিখাত দখলদার কোম্পানির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিদ্রোহ হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় ৫২ টা দেশের ২ মিলিয়ন মানুষ এদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। https://archive.is/Za9T8

ক্ষতিকর হবার পরেও কৃষকরা কেন তাদের কাছ থেকে বীজ কেনে? এর একটা কারণ হল সরকারী বীজ অপ্রতুল। অথচ কৃষি-প্রধান বাংলাদেশে সবার আগে কৃষকদের বীজ নিশ্চিত করার দরকার ছিল।

অনেকেই গোল্ডেন রাইসের পক্ষে আবার কেউ বিপক্ষে। কিন্তু সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ নিজের স্বাস্থ্য ও দেশের কৃষকের পক্ষে যেটা যাবে সেটা।

যারা গোল্ডেন রাইসের পক্ষে কথা বলে তাদের অনেকেই বিটি বেগুনের পক্ষে ছিল। কিন্তু বিটি বেগুনের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

বিটি বেগুন চাষের জন্যে যাদের ২০১৪-১৫ সাল থেকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন পরের বছর (২০১৫-১৬) তে চারা নিয়েছিলেন, ৫ জন ২০১৬-১৭ তে নিয়েছিলেন এবং মাত্র ৩ জন ২০১৭-১৮ তে নিয়েছেন। ক্রমে কৃষক আগ্রহ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে ৭৩% কৃষক আর বিটি বেগুন চাষ করার কোন আগ্রহ প্রকাশ করেন নি।” [নয়া কৃষি আন্দোলন]

বাংলাদেশের জন্যে বেগুন ও আলুতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিঙয়ের ফলে কোন অর্থনৈতিক লাভ নেই। এই দুটি সবজিকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজার বাড়বে না বরং সংকুচিত হয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশী, কারণ বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে যারা সবজি আমদানি করে তারা জিএমও নয় এমন খাদ্যের জন্যেই কেনে।” [উপরোক্ত]

এএফপি-এর খবরে বলা হয়েছে যে ২৮টি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-ভুক্ত দেশের মধ্যে ১৯টি দেশ তাদের দেশে জিএমও ফসল উৎপাদন করবে না বলে ২০১৫ সালের অক্টোবরের ৩ তারিখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রিয়া, নেদারন্যাল্ড, পোল্যান্ড, ইতালী, হাঙ্গেরি, গ্রীস, বুলগেরিয়া সহ ১৯টি দেশ রয়েছে। ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, স্লোাভেনিয়া ও মাল্টা পরে আবেদন করেছে যে তারাও জিএমও ফসল উৎপাদন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বেলজিয়ামও তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এদিকে বৃটেনে ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডও নিষেধাজ্ঞা জারী করছে।” [উপরোক্ত] https://uk.news.yahoo.com/most-eu-nations-seek-bar-gm-crops…

ব্রাজিলে জিএমও ফসলে ব্যবহার করা এগ্রোকেমিকেলের ৫০টি উপাদানের মধ্যে ২২টি অন্যান্য দেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। তারা বলছে এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।” [উপরোক্ত] http://news.agropages.com/News/NewsDetail---14870.htm

আমাদের দেশের প্রচুর শাক সবজি রয়েছে যা ভিটামিন এ সমৃদ্ধ, বিশেষ করে হলুদ রংয়ের সবজি ও ফল যেমন মিষ্টি কুমড়া, গাজর, পাকা পেঁপে, বাঙ্গী, কাঁঠাল, আম, কলা। অনেক ধরণের শাক যেমন কাঁটানটে, সজনে-পাতা, কলমি, পুঁইশাকসহ আবাদি ও অনাবাদী শাক রয়েছে। চালের মধ্যে ভিটামিন এ আলাদা করে ঢোকাবার দরকার নেই, ... ” [উপরোক্ত]

এদিকে আর্পাড পুস্টেই পরীক্ষাগারে ইঁদুরের দেহে জিএমও আলু প্রয়োগ করে দেখে যে এতে খারাপ ফল পাওয়া যাচ্ছে। এই খবর প্রকাশিত হলে কোন এক বিচিত্র কারণে তার সংস্থা স্কটল্যান্ডের রোয়েট ইন্সটিটিউট তাকে সাসপেন্ড করে এবং তাঁর সেই ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই কুকর্মে মিডিয়া হাত মেলায়। কিন্তু এটা জানতে পেরে ইউরোপ ও আমেরিকার ২১ জন বিজ্ঞানী ১৯৯৯ সালে তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেন। http://bit.ly/2GZE2bQ

আর বাংলাদেশে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার হাজারো কৃষক সিনজেনটার হাইব্রিড টমেটো বীজ কিনে নিঃস্ব, প্রতারিত ও রক্তাক্ত হয়েছিল। https://archive.is/8676l

দেশের কৃষিখাত যদি এই রকম গুটিকয় বহুজাতিক কোম্পানির হাতে চলে যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও কৃষকরা আত্মহত্যা করা শুরু করবে, এটা নিশ্চিত। পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আমরা ঢালাও ভাবে জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুডের বিপক্ষে নই। আমাদের দেখতে হবে কোনটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। কোনটা আমাদের দেশের জন্য এবং দেশের কৃষকের জন্য ক্ষতিকর। ঐ সকল পণ্য ও কোম্পানি আমাদের বর্জন করতে হবে। নীতিমালা এমনভাবে করতে হবে যেন দেশের ও দেশের মানুষের ক্ষতি না হয়।


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট