ভারত কখনোই প্রতিবেশী দেশের বন্ধু হতে পারে না। ( ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে )


দেশের দুএকটা রাজনৈতিক দল এবং গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী যেই প্রতিবেশীকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে। রাষ্ট্র যেহেতু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সে রাষ্ট্রকে টিকে থাকার জন্য তার যেমন শত্রæ-মিত্র চেনা দরকার। রাষ্ট্র থাকলেই ব্যবস্থা-বাণিজ্য, বিদ্যা-শিক্ষা, আয়-উন্নতি হওয়ার কথা। ফলে একটা বৃহৎ প্রতিবেশী যে বন্ধু নয়, সেটা বুঝতে পারা একটা ভীষণ রাজনৈতিক সাফল্য।

কেননা তিস্তা নদীসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্য হিসা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তার কোনোটিই হয়নি। তিস্তা চুক্তি হয় হয় করেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। ভারতের কিছু কিছু মিডিয়া যারা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী তারা এবং এখানেও (বাংলাদেশে) কেউ কেউ মিনমিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছে, যে মমতা ব্যানার্জি নাকি এটা করতে দিচ্ছে না। 

আমরা সবাই জানি, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে অথবা সম্পর্ক নষ্ট করার ক্ষেত্রে অর্থাৎ তার পররাষ্ট্রবিষয়ক ব্যাপার কেন্দ্রীয় সরকারের জুরিসডিকশনই একমাত্র জুরিসডিকশন। সেখানে রাজ্যগুলোর কিছুই করার থাকে না।

এখানে খুব স্পষ্ট করে বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গকে  আসলে কেন্দ্রীয় সরকার বা রাজনৈতিক ও কূটনৈকিতকরা একটা উপলক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে বাংলাদেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করতে চায়। বছরের পর বছর যে রাষ্ট্র তার নিকটতম প্রতিবেশীকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ন্যায্য পাওনা দেয় না। তাকে বন্ধু মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ বাংলাদেশের মানুষ দেখে বলে আমার মনে হয় না।

শত্রুতার পর্যায়টা কোন পর্যায়ে আছে? যেটা প্রত্যক্ষ, একদিকে যখন দুই দেশের বন্ধুত্বের কথা হচ্ছে তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারত একের পর এক ডবিøউটিওর এন্টি ডাম্পিং কমিশনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। প্রথমে ব্যবহার করেছিল, ব্যাটারির ব্যাপারে, তারপরে ঝুট প্রোডাক্টের ব্যাপারে সর্বশেষ সফর শেষ হতে না হতেই হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ব্যাপারে তারা এন্টি ডাম্পিংকে প্রিটেক্স হিসেবে ব্যবহার করে। আর এসব তারা করছে সামান্য ব্যবসার জন্য।

যেখানে দুই দেশের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা আছে। এর মধ্যে ভারতই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। কোনোটা ৮ কোটি, কোনোটা একশকোটি টাকার ব্যবসা, সেগুলো বাধাগ্রস্ত করার জন্য এই আইনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করছে ভারত। ঐতিহ্যগতভাবে যেটাকে ট্যারিফ ব্যারিয়ার, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার।

অন্যদিকে ভারতের অকৃতজ্ঞতাও আছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ফরমাল ট্রেড আছে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার (৫৪ হাজার কোটি টাকা)। ভারতের ইনফরমাল ট্রেড ১১ বিলিয়ন ডলার পণ্যের বাজার বাংলাদেশে।

২০১৬-১৭ বাজেট ডকুম্যান্টস অনুযায়ী, অন্যান্য দেশের শ্রমিক-কর্মকর্তারা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেতন হিসেবে আপন আপন দেশে পাঠায়। তার মধ্যে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা) বাংলাদেশ থেকে ভারত লাভ করে।

প্রায় সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ভারত আয় করে থাকে। টাকার উৎস হিসেবেও বাংলাদেশ একটা বিরাট ঘটনা (সম্মান পাওয়া) ভারতের কাছে হওয়া উচিত। সাধারণত একজন ব্যক্তি প্রতিদিন যদি একজন কলা বিক্রেতার কাছ থেকে এক ডজন করে কলা কিনে, তাহলে ওই কলা বিক্রেতা সেই ক্রেতাকে দেখলে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কারণ তিনি ওই বিক্রেতার একজন নিয়মিত ক্রেতা। 

তিনি বিক্রেতার জীবন-জীবিকার সঙ্গেে জড়িত, তার অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। ভারত যেখান থেকে প্রতি বছর সাড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার আয় করে, তার সঙ্গে যেই ধরনের সমীহপূর্ণ ব্যবহার করা উচিত, তা তো করেই না। বরং তারা সীমান্তে বছরের পর বছর আমাদের নাগরিকদের অন্যায়ভাবে হত্যা করে চলেছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম হচ্ছে চাণক্যপুরী। ভারতীয় কূটনৈতিক স্টাবিøশম্যান্ট এখনো হাজার বছর আগে সেই চাণক্যনীতি, যা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে। যেখানে পররাষ্ট্র নীতি কি হবে তা বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, তোমার আশপাশের যে ছোট ছোট রাষ্ট্র আছে তাদের দমন করে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখ। 

সেই আমলে তাদের জন্য কতটা সঠিক ছিল তা আমি জানি না। কিন্তু আজকের জামানায় যেখানে মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উত্থান ঘটেছে, আধুনিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ হয়েছে, জাতি রাষ্ট্রের উত্থান হয়েছে, বাংলাদেশে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আপন দেশ স্বাধীন করে তার মধ্যে বিকশিত হয়ে উঠবার লক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে। সেখানে ভারত সারাজীবন যদি তার চাণক্যনীতিতে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাহলে এটা তার একটা অন্তর্গত সীমাবদ্ধতা। যেটা এই অঞ্চলে তাদের শত্রæতা তৈরি করা ছাড়া অন্যকিছু করতে পারবে না।

কারণ অন্য জাতিগোষ্ঠী, আশপাশের জনগোষ্ঠীকে ছোট করে দেখে, তাদের অবজ্ঞা করে, তাদের মর্যাদাবোধকে অসম্মান করে সে নিজে তাদের কাছ থেকে আন্তরিক সহযোগিতা পাবে না। কিছু দালাল-টালাল সারা পৃথিবীতে পাবে। সভ্যতার প্রথম থেকেই সবদেশে কিছু দালাল থাকে। সেটি থাকতেই পারে কিন্তু তারা একটি জনগোষ্ঠীর মূল শ্রোতধারাকে-চিন্তা-ভাবনাকে কখনই প্রতিনিধিত্ব করে না। 

এই অঞ্চলে ভারতের যে তুলনামূলকভাবে অনেক বড় অর্থনীতি, ভারত যদি তার চাণক্যনীতি বাদ দিয়ে আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সত্যিকার অর্থে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতো। তাহলে ভারত এই অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে নেতাতে পরিণত হতো। যে দেশ নিজের অঞ্চলে স্বাভাবিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক যোগ্যতা রাখে না, তার বিশ্ব নেতৃত্ব পাবার যত আকাক্সক্ষাই থাকুক তা পরিহার করতে হবে।


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট